দেশভাগের ক্রান্তিলগ্নে সমগ্র বাংলাকে ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে পর্বতপ্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অভিন্ন অংশ হিসেবে রক্ষা করেছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সোমবার ভারতকেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে এই ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্য সরকারি কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারায় দুঃখপ্রকাশ করে তিনি জানান, প্রযুক্তির মাধ্যমেই তিনি এই ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পুরো পশ্চিমবঙ্গকেই অন্তর্ভুক্ত করার চক্রান্ত শুরু হয়। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একাই জনমত গঠন করে এবং তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলে সেই চক্রান্ত প্রতিহত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “লড়াইতে জেতার পর শ্যামাপ্রসাদ নিজেই বলেছিলেন— কংগ্রেস দেশ ভাগ করেছে, আর আমি পাকিস্তানকে ভাগ করেছি।” মোদির সংযোজন, শ্যামাপ্রসাদের সেই ঐতিহাসিক ‘হুঙ্কার’ এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি আজও দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মতে, স্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে তবেই সাফল্য আসে, আর শ্যামাপ্রসাদের জীবন ছিল সেই আদর্শেরই প্রতিফলন।

এ দিনের বক্তৃতায় কাশ্মীর প্রসঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের আত্মত্যাগের কথাও মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এক দেশে দুই বিধান, দুই নিশান, দুই সংবিধান চলতে পারে না— এই আওয়াজ শ্যামাপ্রসাদ তুলেছিলেন। এটা শুধু মুখের কথা ছিল না, এর জন্য তিনি লড়াই করেছেন এবং নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন।” প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে দাবি করেন যে, রাষ্ট্রবাদী সরকার হলেই রাষ্ট্রনায়কেরা প্রকৃত সম্মান পান এবং বর্তমান বিজেপি সরকার শ্যামাপ্রসাদের সেই অসমাপ্ত লড়াইকে পূর্ণতা দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত দুই বছর ধরে দেশজুড়ে তাঁর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করায় রাজ্য সরকারকেও অভিনন্দন জানান তিনি।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির খতিয়ান তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদি জানান, যে সময়ে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তখন দেশে কংগ্রেসের একাধিপত্য ছিল। সেই প্রভাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভিন্ন মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার সাহস দেখিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, যা দেশে গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের ভিত্তি গড়ে তোলে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিনের সেই ভারতীয় জনসঙ্ঘের আদর্শই আজ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল ভিত্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই দর্শন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলার মাটিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে ‘দ্বিগুণ আনন্দের’ বলে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একদিকে ড. মুখার্জির ১২৫তম জন্মজয়ন্তী, অন্যদিকে তাঁর নিজের রাজ্য বাংলাতেই এই বিশেষ আয়োজন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত বিজেপি সরকারের উদ্যোগে এই উৎসব উদযাপিত হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গবাসীর পক্ষ থেকে তাঁদের এই মহান সুপুত্রকে এটি একটি অত্যন্ত আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।

পরিশেষে, সংসদের অধিবেশনে দেওয়া শ্যামাপ্রসাদের একটি বিখ্যাত বক্তৃতার লাইন উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রাষ্ট্রীয় একতার ধরাতলেই সোনালি ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করা যেতে পারে।” প্রধানমন্ত্রীর মতে, ড. মুখোপাধ্যায় কেবল এই কথা বলেননি, বরং জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই বিশ্বাসকে নিজের অন্তরে লালন করে গিয়েছেন। আজকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই দূরদর্শিতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।