সরকারি পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে শুরু হয়েছে ‘সেবা সেতু’ শিবির (Seva Setu Camp)। কিন্তু শিবির শুরু হতেই অন্নপূর্ণা যোজনার (Annapurna Yojana) টাকা না পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষোভ-বিক্ষোভের ছবি সামনে এল। কোথাও বিডিও-র (BDO) বিরুদ্ধে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের অভিযোগ, কোথাও শিবিরে ভাঙচুরের ঘটনা, আবার কোথাও রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ। একই সঙ্গে বার্ধক্য ও বিধবা ভাতা নিয়েও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়।

শুক্রবার মালদহের (Malda) হরিশ্চন্দ্রপুরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় স্থানীয় বিডিও-র বিরুদ্ধে অভিযোগকে কেন্দ্র করে। হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লকের বিডিও ধ্রুবাশিস সামন্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্র জমা দিতে যাওয়া মহিলাদের সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করেছেন। বিক্ষোভকারী মহিলাদের দাবি, আবেদনপত্রের কোনও মূল্য নেই এবং শুধুমাত্র তাঁদের মনরক্ষার জন্যই তা নেওয়া হচ্ছে। এমন মন্তব্য করা হয়েছে। অভিযোগ ঘিরে স্থানীয় বিজেপি (BJP) নেতৃত্ব বিডিও-র প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, মহিলাদের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। 
মালদহের রতুয়া-২ ব্লকের মহারাজনগর হাই মাদ্রাসাতেও অন্নপূর্ণার টাকা না পাওয়া নিয়ে বিক্ষোভের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে সেবা সেতু শিবিরে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভকারীদের বড় অংশই মহিলা বলে খবর। তাঁদের প্রশ্ন, অন্নপূর্ণা যোজনার কাজ না হলে শিবিরে এসে তাঁরা কী পরিষেবা পাবেন? পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। পুলিশের গাড়ি ঘিরেও কিছু সময় বিক্ষোভ চলে বলে অভিযোগ। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিংহ জানিয়েছেন, জেলার একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। তবে কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি। সেবা সেতু শিবিরগুলিতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং আধিকারিকেরা বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন।

অন্যদিকে, কোচবিহার শহরের রবীন্দ্র ভবনেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একদল মহিলা। তাঁদের অভিযোগ, তাঁরা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রায় চার মাস ধরে টাকা পাচ্ছেন না। বারবার আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি তাঁদের। কারও আবেদনের অবস্থা ‘প্রক্রিয়াধীন’ দেখাচ্ছে। বিক্ষোভের জেরে রবীন্দ্র ভবনের সেবা সেতু শিবিরের পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। একদল মহিলা মূল গেটের সামনে গিয়ে স্লোগান দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোতোয়ালি থানার পুলিশ পৌঁছয়। পরে ফের শিবিরের পরিষেবা স্বাভাবিক হয়।

উত্তর দিনাজপুরেও এদিন দেখা গিয়ে একই চিত্র। ‘সেবা সেতু’-এ উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘী সহ একাধিক ব্লক দফায় দফায় অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। বেশ কিছু শিবিরে অন্নপূর্ণা যোজনার কাউন্টার না থাকারও অভিযোগ উঠেছে। তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে শেষ পর্যন্ত  অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম জমা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

শুধু মালদহ, কোচবিহার বা উত্তর দিনাজপুর নয় সুন্দরবন এবং উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমাতেও একই ধরনের ক্ষোভের ছবি সামনে এসেছে। মাটিয়া থানার গোপালপুর মোড়ে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে শতাধিক মহিলা টাকি রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে সেবা সেতু শিবিরে গিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি। এরপরই তাঁরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। অবরোধের জেরে টাকি রোডে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও টাকা মেলেনি। পুজোর আগে আবেদন যাচাই করে যোগ্য উপভোক্তাদের দ্রুত টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। হিঙ্গলগঞ্জের বিডিও দেবদাস গাঙ্গুলীর দাবি, শিবিরে কোনও ফর্ম বিতরণ করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় বার্ধক্য ও বিধবা ভাতা নিয়েও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 


প্রসঙ্গত সরকারি প্রকল্পের আবেদন, নথি যাচাই এবং আটকে থাকা পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ২ থেকে ৪ অক্টোবর রাজ্যজুড়ে সেবা সেতু শিবির আয়োজন করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনা-সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এই শিবিরগুলিতে। ফলে যে শিবিরের উদ্দেশ্য সরকারি পরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই শিবিরকে ঘিরে জেলায় জেলায় শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।