পুজোর ঢাকের বাদ্যি থামতে না থামতেই কি রাজ্যজুড়ে ফের শোনা যাবে বুলডোজারের গর্জন? উৎসবের আলো নিভতে না নিভতেই কি মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁইটুকু হারিয়ে পথে বসবেন অসংখ্য দিনদরিদ্র মানুষ? নবান্নের অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে আসা সাম্প্রতিক জমি জরিপের খবর অন্তত সেই অশনি সংকেতই দিচ্ছে।

সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের নামে রাজ্যজুড়ে এক মহা-জরিপের নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। খোদ নবান্নের নির্দেশে রাজ্যের ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভে ডিরেক্টরেট প্রতিটি সরকারি অফিস, ফাঁকা প্লট, রাস্তা, খাল এবং বাঁধের ধারের জমির পুঙ্খানুপুঙ্খ সীমানা নির্ধারণের কাজে নামছে। স্যাটেলাইট সিস্টেম ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রতিটি ইঞ্চির হিসাব কষে বসানো হবে সীমানার খুঁটি বা পিলার। আপাতদৃষ্টিতে এই পদক্ষেপ সরকারি সম্পত্তি রক্ষার এক রুটিন কাজ মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আতঙ্ক। প্রশ্ন উঠছে, নিখুঁত মানচিত্র তৈরির এই ছক কি আসলে এক নির্মম উচ্ছেদ অভিযানেরই নীল-নকশা?

যাঁরা যুগ যুগ ধরে রেললাইন, খাল পাড় বা রাস্তার ধারে সামান্য একটা ত্রিপল বা টিনের চালের নীচে দিন গুজরান করছেন, এই জরিপের খবর তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। উৎসবের মরশুমে যখন গোটা রাজ্য আনন্দে মাতোয়ারা, তখন এই প্রান্তিক মানুষগুলির চোখেমুখে কেবলই ভিটেমাটি হারানোর ভয়। এর আগে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরপরই রেল, কেন্দ্রীয় সংস্থা বা পুরসভার জমি দখলমুক্ত করার নামে যেভাবে বুলডোজার চালানো হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। এবার কি তবে খোদ রাজ্য সরকারের উদ্যোগেই সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে?

শাসকের এই 'লাল চোখ' বুঝিয়ে দিচ্ছে, বড় বড় জমি মাফিয়া বা প্রভাবশালীদের বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে, রাস্তার ধারের অসহায় মানুষগুলির উপর ক্ষমতা প্রদর্শন করাই যেন প্রশাসনের কাছে বেশি সহজ। একদিকে 'জনদরদী' সরকারের তকমা, অন্যদিকে সেই দরিদ্রদেরই মাথার ছাদ কেড়ে নেওয়ার এই দ্বিচারিতা রাজ্যের বুকে এক ভয়াবহ অমানবিকতার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চলেছে। পুজোর আনন্দ তাই আজ পুরোপুরি ফিকে হয়ে আসছে শাসকের আসন্ন বুলডোজার-নীতির আতঙ্কে।