রুপোলি পর্দার ঝলমলে আলো, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর করতালি—একটা সময় এগুলোই ছিল তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী। মৃণাল সেন থেকে সন্দীপ রায়, টলিউডের দিকপাল পরিচালকদের ছবিতে যাঁর অভিনয় সমৃদ্ধ করেছে বাঙালি দর্শককে। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় মেগা ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’র সেই চরিত্রটিকে আজও ভোলেনি দর্শক। তিনি নিমাই ঘোষ। কিন্তু পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ২০০-র বেশি সিনেমায় অভিনয় করা এই গুণী শিল্পী আজ বিনোদন জগতের হেডলাইন থেকে বহু দূরে, এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি।

আরও পড়ুন: ট্র্যাফিক জ্যামে ২ ঘণ্টা আটকে বাস, ভারতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন পানামা কোচ

কলকাতার এক ছোট্ট সরকারি আবাসনের আলো-বাতাসহীন, স্যাঁতসেঁতে একটা ঘরে এখন কাটে তাঁর দিন। দেওয়ালে নোনা ধরা দাগ, এক কোণে পড়ে থাকা জামাকাপড়ের স্তূপ আর একটা ভাঙা চৌকি—এটাই এখন এই প্রবীণ অভিনেতার চেনা জগৎ। যে মানুষটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বহু চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন, আজ তিনি নিজেই এক নিঃসঙ্গতার প্রতিমূর্তি। ‘যারা ছবিকে শুধু ব্যবসা মনে করে, তারা আমাকে খোঁজে না”—নিমাই ঘোষের এই একটি বাক্যই যেন বর্তমান বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির নির্মম চরিত্রকে নগ্ন করে দেয়।

আরও পড়ুন: #VoteChor: জনপ্রতিনিধিই নিরাপদ নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? কুণালের উপর পরপর হামলায় বিজেপিকে নিশানা অভিষেকের

শুধু দক্ষ অভিনেতাই নন, নিমাই ঘোষ একজন অসাধারণ কবিও। তাঁর কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই বইয়ের রয়্যালটির টাকাও তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। সিনেমার ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা কিছু নয়। বহু ছবিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার পরও “পরে দেব” বলে আটকে রাখা হয়েছে তাঁর পারিশ্রমিক। এই আকাশছোঁয়া বাজারের দিনে যেখানে দু’বেলা দু’মুঠো অন্নসংস্থান করাই এক কঠিন লড়াই, সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রাপ্য সম্মান এবং পারিশ্রমিক দুটো থেকেই তিনি বঞ্চিত।

আরও পড়ুন: ফের বিপর্যয় নেপালে, তুষারধসে নিখোঁজ অন্তত ১০ জন

নিমাই ঘোষের এই পরিণতি কোন একক ঘটনা নয়, বরং বিনোদন দুনিয়ার এক চিরন্তন অন্ধকার দিক। আমরা প্রায়শই তথাকথিত ‘স্টার’ বা তারকাদের নিয়ে মেতে থাকি, কিন্তু পর্দার আড়ালে বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে যাঁরা একটা সিনেমা বা ধারাবাহিককে সফল করে তোলেন, তাঁদের শেষ বয়সের খোঁজ রাখার প্রয়োজন মনে করে না এই ইন্ডাস্ট্রি। কাজ ফুরোলেই যেখানে অভিনেতার গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়।

আজ এই গুণী শিল্পীর কোনও করুণা বা দয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি চান শুধু তাঁর কাজের সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রাপ্য সম্মান। ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু যে দর্শক তাঁর অভিনয় দেখে বড় হয়েছে, তাঁরা আজও তাঁকে মনে রেখেছে। নিমাই ঘোষের এই গল্প আমাদের সময়ের এক নির্মম আয়না, যা মনে করিয়ে দেয়—শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছাড়া একজন প্রকৃত শিল্পীর আর কোনও বড় প্রাপ্তি হতে পারে না।