বাংলা নাট্যজগতের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক মহীরুহ। যাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর, মঞ্চ কাঁপানো অভিনয় আর অসাধারণ নির্দেশনা এক সময় বুদ করে রেখেছিল আপামর বাঙালিকে। তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ আজ, সময়ের নিয়মে হোক বা নতুন প্রজন্মের উদাসীনতায়, থিয়েটারের এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে নিয়ে চর্চা যেন অনেকটাই ফিকে। সেই আক্ষেপকে সঙ্গী করেই নাট্যপ্রেমীদের মনে আজ বারবার গুনগুনিয়ে উঠছে কবিগুরুর সেই চেনা গান— “তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না...”।

আরও পড়ুন: খুনের উদ্দেশ্য নিয়ে অপহরণের চেষ্টার ধারা দিয়েছে পুলিশ: থানা থেকে বেরিয়ে জানালেন কুণাল

১৯৬০ সালে তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল কিংবদন্তি নাট্যদল ‘নান্দীকার’। ‘তিন পয়সার পালা’, ‘শের আফগান’ কিংবা ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’-র মতো কালজয়ী নাটকে তাঁর অভিনয় ও পরিচালনা বাংলা থিয়েটারকে এক আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ‘কুশীলব’ নাট্যদলের মাধ্যমেও তিনি তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শুধু মঞ্চেই নয়, রুপোলি পর্দায় তপন সিংহের ‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রে ‘ছদ্মবেশী’ ডাক্তার কিংবা ‘গণদেবতা’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও সিনেমা প্রেমীদের মনে দাগ কেটে রয়েছে।

আরও পড়ুন: আদালতের সঙ্গে চালাকি! আরজিকর-কাণ্ডে শেষকৃত্য নিয়ে রাজ্য পুলিশকে তীব্র ভর্ৎসনা হাই কোর্টের

আজকের আধুনিক থিয়েটারের যুগে দাঁড়িয়ে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়শৈলী এবং নাট্যভাবনা নিয়ে আলোচনা ভীষণভাবে প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ বা গবেষণার খরা চোখে পড়ার মতো। থিয়েটার অ্যাকাডেমি বা নাট্য উৎসবগুলির চেনা বৃত্তের বাইরে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর কাজের পরিচয় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ খুবই সীমিত। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন- “অজিতেশ রেগে গেলে চিৎকার করত, কিন্তু ৫ মিনিট পরেই এসে বলত, কিছু মনে করিস না।” মানুষটা বাইরে খুব রাগী মনে হলেও ভিতরে খুব নরম ছিলেন। 

আরও পড়ুন: বরাদ্দ মিলছে না তিনমাস! রাজ্যের স্কুলে স্কুলে বন্ধের মুখে মিড-ডে মিল

১৯৮৩ সালের ১৩ অক্টোবর, দুর্গাপুজোর সপ্তমীর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। স্ত্রী রত্না বন্দ্যোপাধ্যায় পরে লিখেছিলেন, সেদিন রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরেছিলেন। পাড়ার ‘সন্ধানী’ ক্লাবের ছেলেরা তাঁকে প্যান্ডেলে যেতে বলেছিল। রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ হঠাৎ শরীর খারাপ হয়, পাড়ার ছেলেরাই ডাক্তার ডেকে আনে, কিন্তু আর বাঁচানো যায়নি।  

আরও পড়ুন: পিতৃতন্ত্র বনাম ‘বন্দেমাতরম’! বিজেপি সাংসদের আজব যুক্তিতে চোখ কপালে উঠল হৃতিকের

নাট্যবোদ্ধাদের একাংশের মতে, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নাট্য-দার্শনিক। তরূণ প্রজন্মের থিয়েটার কর্মীদের উচিত তাঁর কাজের মূল্যায়ন করা, তাঁর অনুবাদ করা নাটকগুলি নিয়ে আবার নতুন করে ভাবা। তা না হলে এই কিংবদন্তির সৃষ্টি ও অবদান সত্যিই একদিন মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। আর বাঙালির সাংস্কৃতিক দৈন্যতার প্রতীক হয়ে থেকে যাবে কেবলই এই দীর্ঘশ্বাস— “তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না”।