বিশ্ব জুড়ে বন্য হাতিরা আজ হুমকির মুখে। বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের দুই প্রজাতির হাতিদের অস্তিত্ব সংকটে। বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত তারা। ১২ আগস্ট ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে বা বিশ্ব হাতি দিবস। জানেন কি এই হাতিদের পূর্বপুরুষ ধরা হয় প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথকে যারা আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত?এর পরে আসে আধুনিক হাতি। এই নিয়ে লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী।
বিশ্ব জুড়ে দিনে দিনে বিপন্ন হচ্ছে হাতি। প্রকৃতির এই অনন্য সম্পদটি আজ অস্তিত্বের সংকটে। গত দশবছরে বিশ্ব জুড়ে হাতি কমেছে প্রায় ৬৫ ভাগ। তাই হাতির অস্তিত্ব সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মানুষকে সচেতন করতে প্রতি বছর ১২ অগাস্ট পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস বা ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে। হাতি উৎপত্তির ইতিহাস আজকের নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে। যেমন হাতির পূর্বপুরুষ ম্যামথ। এই ম্যামথ থেকেই আমরা খুঁজে পাই হাতির অস্তিত্ব।
ম্যামথ- ম্যামথ আকারে ছিল হাতিদের চেয়ে বড়। এদের ছিল বিশাল দাঁত, লোমে ভরা দেহ আর বড় শুঁড়। এরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে চার-পাঁচ হাজার বছর আগে। গবেষকেরা মনে করছেন আরও অনেক বেশি সময় এরা টিকে ছিল আলাস্কার সেন্ট পল দ্বীপে। ম্যামথদের রোজ কমপক্ষে প্রায় ৭০-২০০ লিটার জলের দরকার হত। কিন্তু যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেল, এর ফলে পানীয় জল নোনা জলে পরিণত হল। ফলে জলের অভাবে ধীরে ধীরে তারা এগিয়ে গেল বিলুপ্তির পথে। গবেষণা বলছে ম্যামথরা সর্বশেষ বেঁচে ছিল রাশিয়ার উত্তর-পূর্ব প্রান্তসীমার দ্বীপ র্যাঙ্গেলে।২০০৭ সালে একটি শিশু ম্যামথের দেহ উদ্ধার হয় সাইবেরিয়ার ইয়ামাল পেনিনসুলা থেকে। কঠিন বরফে জমে যাওয়া ম্যামথটির দেহ অক্ষতই ছিল। এর থেকে ধারণা করা হয় যে বিলুপ্ত এই প্রজাতির কোটিখানেক মৃতদেহ ঢাকা পড়ে আছে সাইবেরিয়ার বিশাল বরফ ঢাকা অঞ্চলে। অনেকে মনে করছেন অত্যধিক শিকারের ফলেও তারা বিলুপ্ত হয়েছে।
ম্যামথ থেকেই কি হাতি ?
ম্যামথ ও আধুনিক হাতি ক্রমানুসারে একই পূর্বপুরুষ থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ বছর একইসঙ্গে সমান্তরাল ভাবে বিকশিত হয়েছিল। প্রায় ৬০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকান হাতির মূল পরিবার ‘এলিফ্যান্টিডি’ (Elephantidae)-র উৎপত্তি, যার একটি শাখা থেকে ম্যামথ এবং অন্য শাখা থেকে বর্তমান যুগের আধুনিক হাতিদের উৎপত্তি ঘটে। প্রায় ৪৪ লক্ষ বছর আগে ম্যামথ ও এশীয় হাতির পথটা আলাদা হয়ে যায়। শেষ ম্যামথটি মারা যায় প্রায় ৪,০০০ বছর আগে।প্রাইমলেফাস হল আধুনিক হাতির বিবর্তনের ধারার প্রথম আদি পূর্বপুরুষ। কথিত আছে, প্রাচীন মগধ রাজ্যেই নাকি প্রথম হাতির ব্যবহার হয়েছিল এবং প্রাচীন ভারতের বাংলায় প্রথম হাতি পোষ মানানোর রেওয়াজ শুরু হয়েছিল সেখানেই।
হাতির জীবনচক্র- হাতি নিয়ে সাধারণের কৌতূহলের কোনও শেষ নেই কিন্তু তাঁদের সেই কৌতূহল চিড়িয়াখানা এবং জঙ্গল সাফারি অবধিই সীমিত। কিন্তু হাতিকে চেনার, জানার পরিধি অনেক বিস্তৃত। হাতিকে নিয়ে কিছু মিথ রয়েছে। হাতি নাকি ১০০ থেকে ১৫০ বছর বাঁচে। আসলে তা নয়। হাতির লাইফ স্প্যান ৬৫ থেকে ৭০ বছর। কারণ হাতি-বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির প্রথম দাঁত থেকে শেষ দাঁত প্রত্যেকটা দাঁতের মাপ আছে, স্থায়িত্ব কাল আছে। শেষ মোলার বা সহজ কথায়, অন্তিম দাঁতটি ৬৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে পড়ে যায়। তখন হাতি আর খাবার চিবিয়ে খেতে পারে না। হাতির বিশালকায় শরীরে প্রচুর পুষ্টির প্রয়োজন হয় আর তখন না খেতে পেয়ে অপুষ্টিতে মারা যায় তারা। তবে পোষা হাতির ক্ষেত্রে তা হয় না। এদের খিচুড়ি বা নরম ভাত খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। সাধারণত বন্য হাতির চাই প্রচুর খাবার। কথায় বলে না হাতির খোরাক! যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ কেজি। তবে হাতির খাবার সারা বছর একরকম থাকে না। গরমে তার জলের প্রয়োজন। যেসব খাবারের মধ্যে জল থাকে যেমন কলাগাছ জাতীয় খাবার বেশি খায় গরমে। বর্ষায় যেসব খাবারে কম জল আছে, তা খায়। শীতে শুকনো খাবার খায়।
হাতি সমাজে মেয়েদেরই আধিপত্য- হাতিদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। তারা দলবদ্ধ জীব। দলের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক মেয়ে হাতি দল পরিচালনা করে এবং সেই হয় দলের লিডার। মাহুতেরা তাকে বলে ‘রানি ঢুঁই’। সেই দলে পুরুষ হাতিও থাকে। সবথেকে শক্তিশালী যে পুরুষ হাতি সেই দলকে সুরক্ষিত রাখে। একটা দল যখন এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যায় দলের শক্তিশালী পুরুষ হাতিরা পিছনে থাকে। যাতে অ্যাটাক হলে দু’-চারটে পুরুষ হাতি নিয়ে তাড়া করতে পারে। এই হাতিকে বলে ব্রিডিং বুল। এই ব্রিডিং বুল এবং দলের সক্রিয় মাদি হাতির মধ্যে প্রজননচক্র চলে। শিশু হাতি জন্ম থেকেই পালের অন্যান্য সদস্য মেয়ে হাতি ও মায়ের নিবিড় সুরক্ষায় থাকে।
হাতির সুরক্ষায় আধুনিক যুগে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে হাতির বাসস্থান, করিডর ও বিচরণভূমি ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত সেই সঙ্গে জঙ্গলে খাদ্যের অভাব থাকায় হাতিরা ইদানীং মাঝে মধ্যেই লোকালয়ে চলে আসছে। বেড়েছে জঙ্গল সাফারি। শান্ত জঙ্গল আজ মানুষের পদধ্বনিতে মুখর। হাতি-সহ জঙ্গলের অন্যান্য প্রাণীকুল বিপন্ন। মানুষের ক্রমাগত বনে প্রবেশের ফলে হাতি তার সহজাত ভীতিবোধটুকু হারিয়ে ফেলছে। এই কারণে মানুষ ও হাতির মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়েছে। বেপরোয়া হয়েই মানুষকে আক্রমণ করছে তারা। তাই জঙ্গলে মানুষের আনাগোনা এবং লোকালয়ে হাতি আসা নিয়ন্ত্রণ করতে সচেতনতা তৈরি এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে, জঙ্গলে হাতি যাতে পর্যাপ্ত খাদ্য পায় তা দেখা খুব জরুরি। অবৈধ শিকার হাতিদের বিপন্নতার অন্যতম একটি কারণ। হাতির দাঁতের (আইভরি) লোভে চোরাশিকারিরা হাতি মেরে ফেলছে। যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যায়নি। বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন মেনে হাতি ধরা বা মারার বিরুদ্ধে কড়া শাস্তি নেওয়া জরুরি।
















