আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। সামনে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF)-এর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। তার ঠিক আগে ফের ‘জঙ্গি দমন’-এর বার্তা দিতে তৎপর পাকিস্তান (Pakistan)। জইশ-ই-মহম্মদের (Jaish-e-Mohammed) প্রধান মাসুদ আজহারের (Masood Azhar) মাথার দাম এক ধাক্কায় ২০ লক্ষ টাকা বাড়িয়ে দিল ইসলামাবাদ (Islamabad)। পাকিস্তানি রুপিতে এত দিন যে পুরস্কার ছিল ৫০ লক্ষ টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লক্ষে।

আরও পড়ুন: ১৮ বছরে পা সম্পর্কের! ভালবাসার উদযাপনে শোভন-বৈশাখী

পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ)-র প্রকাশিত নতুন ‘রেড বুক’-এ মাসুদ আজহারের নামও রয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ভারতের মাটিতে একাধিক বড়সড় জঙ্গি হামলার নেপথ্যে রয়েছে এই জইশ প্রধান। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলাতেও তার সংগঠনের নাম উঠে আসে।

মাসুদকে ঘিরে পাকিস্তানের অবস্থান অবশ্য বরাবরই বিতর্কের। ২০২১ সালে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল পাকিস্তানের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। একই সময়ে ইসলামাবাদের দাবি ছিল, মাসুদ পাকিস্তানে নেই, আফগানিস্তানে আত্মগোপন করে রয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সেই দাবি মানেনি। বরং তাদের বক্তব্য, পাকিস্তানের মাটিতেই নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে জইশের প্রধান।

আরও পড়ুন: এটা সনাতনের জাগরণ: গণেশপুজোয় গিয়ে বামেদের কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের সাম্প্রতিক দাবি, মাসুদ বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের নবাবশাহ এলাকায় রয়েছে। ফলে নতুন করে তার মাথার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে নিছক জঙ্গি-বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক মহলের একাংশ। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে অনেকটাই ‘দেখানোর জন্য ব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করা চলে। বিশেষ করে এফএটিএফ-এর বৈঠকের আগে এই সিদ্ধান্তের সময় নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। পাকিস্তান অতীতে এই আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপে সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান এবং জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। এবারও সেই চাপের আবহেই ‘রেড বুক’ আপডেট এবং পুরস্কারের অঙ্ক বৃদ্ধিকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

নতুন রেড বুক ঘিরে আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে। ২০০৮ সালের ২৬/১১ মুম্বই হামলায় অর্থ ও রসদ জোগানোর অভিযোগে ১৯ জন জঙ্গির নাম রাখা হয়েছে তালিকায়। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনের ছবি এবং বিস্তারিত কার্যকলাপের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু বাকি দু’জনের ক্ষেত্রে রয়েছে শুধু নাম। ছবি বা বিস্তারিত পরিচয় নেই। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি নাশকতা। প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা সেই হামলায় ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হন ৩০০-রও বেশি মানুষ। সেই হামলার তদন্তে পাকিস্তানের মাটিতে থাকা একাধিক জঙ্গি ও তাদের সহযোগীদের ভূমিকা সামনে এসেছিল।

এই পরিস্থিতিতে মাসুদ আজহারের নাম রেড বুকে রাখা এবং তার মাথার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, পাকিস্তান যদি সত্যিই জঙ্গি দমনে উদ্যোগী হয়, তা হলে শুধু পুরস্কারের অঙ্ক বাড়ানো নয়, মাসুদ আজহারকে খুঁজে গ্রেফতার করাটাই হওয়া উচিত পরবর্তী পদক্ষেপ।

ভারতের অভিযোগ আরও গুরুতর। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে যে জঙ্গি পরিকাঠামোকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে, সেই ব্যবস্থারই অন্যতম মুখ মাসুদ আজহার। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের ভাবমূর্তি সামলাতে পাকিস্তান কতটা কার্যকর পদক্ষেপ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এখন নজর এফএটিএফ-এর বৈঠকের দিকে। পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারে, নাকি এটিকে নিছক কূটনৈতিক ‘আই-ওয়াশ’ হিসেবেই দেখা হবে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে নয়াদিল্লি।