আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় তিরন্দাজির (Indian Archery) সাফল্য বাড়ছে, কিন্তু সেই সাফল্য যাঁদের হাত ধরে আসছে, তাঁদের প্রতি দায়িত্ব পালনে কি পিছিয়ে পড়ছে ক্রীড়া প্রশাসন? কোচ ডেভ কাজিন্সের (Dave Cousins) পারিশ্রমিক ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে সামনে এসেছে এমনই প্রশ্ন। অভিযোগ, ভারতের কম্পাউন্ড দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন মাস কেটে গেলেও এখনও বেতন পাননি তিনি। দ্রুত পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তাদের কাছে নিজের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন কাজিন্স। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে দায়িত্ব ছেড়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন তিনি। এশিয়ান গেমসে সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এই ঘটনা ভারতীয় তিরন্দাজির প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

কাজিন্সের নেতৃত্বে ভারতীয় কম্পাউন্ড দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স অবশ্য আশাব্যঞ্জক। এশিয়ান গেমসে এই বিভাগ থেকে তিনটি সোনা ও একটি ব্রোঞ্জ পেয়েছে ভারত। সাহিল যাদব ও চিকিথা তানিপার্থির মিক্সড জুটির জয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে নির্ধারিত চার এন্ডের শেষে দুই দলের স্কোর ছিল ১৫৭। শেষ পর্যন্ত শ্যুট-অফে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে সোনা জিতে নেন ভারতীয় তিরন্দাজরা। এই সাফল্যের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো কম্পাউন্ড মিক্সড টিম ইভেন্ট অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। অলিম্পিকের কথা মাথায় রেখে দলের প্রস্তুতি যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, তখন অভিজ্ঞ কোচকে নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরিচিত কাজিন্স গত মে মাসে ভারতের চিফ কম্পাউন্ড কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯৯ ও ২০০৩ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া এই কোচের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই ভারতীয় দলকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা ছিল। তাঁর প্রশিক্ষণে স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্বকাপের একটি পর্বে পৃথিকা প্রদীপও কেরিয়ারের প্রথম ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। কাজিন্সের মতে, অ্যাথলিটদের যথাযথ প্রস্তুতি এবং অনুকূল প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই কাজ এগোচ্ছিল। কিন্তু বেতন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় কোচের সঙ্গে ফেডারেশনের সম্পর্ক এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা কতটা নির্বিঘ্ন থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিষয়টি নিয়ে অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে আর্চারি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া ও স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। এএআইয়ের কোষাধ্যক্ষ ডঃ জোরিস পাউলোস উম্মাচ্চেরিল জানিয়েছেন, সাইয়ের তরফে সমস্যা তৈরি হওয়াতেই টাকা দিতে দেরি হয়েছে। তাঁর দাবি, দু’দিনের মধ্যে বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সাইয়ের এক কর্তার বক্তব্যেও ব্যাঙ্কের প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা উঠে এসেছে। কোচের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব সমাধান এক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন দেওয়া হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

অন্যদিকে, ২০২৮ সালের অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে রিকার্ভ বিভাগকেও নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় তিরন্দাজি সংস্থা। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞ কোচ পার্ক চে-সুনকে ডিসেম্বরের মধ্যে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর প্রশিক্ষণেই দক্ষিণ কোরিয়ার মহিলা দল ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে এবং পুরুষ দল ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে সোনা জিতেছিল। অর্থাৎ, ভারতীয় তিরন্দাজির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের কোচদের ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে ডেভ কাজিন্সের মতো কোচের পারিশ্রমিক নিয়ে টালবাহানা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। অলিম্পিক পদকের লক্ষ্যে শুধু প্রতিভাবান অ্যাথলিট বা দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না, তাঁদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ এবং চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।