নির্বাচন কমিশনের অন্যান্য পদাধিকারীদের অন্ধকারে রেখেই এসআইআর নিয়ে একা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। গত ১০ মাসে কমপক্ষে ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী। এক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসতেই সরব তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। 

নিজের এক্স হ্যান্ডেলে অভিষেক লেখেন, "মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে এবং আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে। কোন এক রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলকেই আঘাত করে। এর জন্য যারা দায়ী, তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। 
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের পর, ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটভুক্ত সমস্ত বিরোধী দল ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কাছে চিঠি লিখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই অভিযোগগুলির যথাযথ পর্যালোচনা বা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়নি। 
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এমন গুরুতর প্রশ্ন যখন বারবার উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও উপেক্ষিত থেকে যায়, তখন তা অনিবার্যভাবেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। 
সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। চূড়ান্ত দায়ভার তাদেরই। 
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কি কোনও পদক্ষেপ নেবে?"

এদিকে মহুয়া মৈত্র এক্সে জানিয়েছেন, "বাংলার এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চলাকালীন আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে অন্তত চারবার দেখা করেছিলাম। সেখানে আমরা তুলে ধরেছিলাম যে, সীমা খান্নার তৈরি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারটি কীভাবে মাঠপর্যায়ে ‘ইআরও-নেট’ (ERONet)-এর প্রবেশাধিকার সীমিত করে এবং ইচ্ছামতো তথ্য পরিবর্তন করে। এখন দেখা যাচ্ছে, দুজন নির্বাচন কমিশনারও ঠিক সেই কথাই বলেছেন যা আমরা বলেছিলাম!"

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের লিখিত আপত্তি জানিয়েছিল দুই নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া, বাদ দেওয়া নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় সংযোজনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাদের সান্ধু এবং যোশীকে অন্ধকারে রেখেই করা হয়েছিল।  দুই নির্বাচন কমিশনার ফর্ম ৬-এ আনা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ছিলেন। এহেন পদক্ষেপকে 'বেআইনি' ও 'অননুমোদিত' বলেও অভিহিত করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের যুক্তি ছিল, 'রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস, ১৯৬০'-এ সংশোধনী না এনে এই ফর্মটিতে কোনও পরিবর্তন করা যায় না। সান্ধুর আপত্তি সত্ত্বেও এই পরিবর্তনগুলি প্রত্যাহার করা হয়নি। এখানেই শেষ নয়, একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এক দিনেই চার বার আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। কিন্তু দাবি, একবারও তাঁদের সেই আপত্তি গুরুত্ব পায়নি।

তবে এই অভিযোগ খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। EC সূত্রের বক্তব্য, কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট সদস্যরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, পরামর্শ দিতে পারেন কিংবা কোনও বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। কিন্তু আলোচনা চলাকালীন এমন মতামতকে অসম্মতি বলা যায় না। কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সমস্ত মতামত বিবেচনা করা হয়।

এখন প্রশ্ন, দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত মন্তব্যগুলিকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করা হবে- সেগুলি শুধুই স্বাভাবিক প্রশাসনিক মতামত, নাকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকৃত মতপার্থক্যের ইঙ্গিত? কমিশন অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, SIR-সহ তার সিদ্ধান্তগুলি কোনও এক ব্যক্তির নয়, তিন সদস্যের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। যদিও তাতে বিতর্ক থামছে না। ইতিমধ্যেই এই রিপোর্ট নিয়ে সরব অখিলেশ যাদব, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কপিল সিব্বাল। ইতিমধ্যেই SIR-এর পরে হওয়া তালিকার ভিত্তিতে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেস নেতা ও আইনজীবী কপিল সিবাল, বিহার ও বাংলার ভোট বাতিল করে জ্ঞানেশ কুমারের সাসপেনশনের দাবি করেছেন।