তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুর নেপথ্যে কোনও একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একাধিক স্তরের চূড়ান্ত গাফিলতি ও বেপরোয়া মনোভাবই মূল কারণ ছিল। বিপর্যয় ঘটার ৮৭ দিনের মাথায় আলিপুর আদালতে জমা দেওয়া প্রায় দু’হাজার পাতার চার্জশিটে এমনই বিস্ফোরক দাবি করল কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’। তদন্তকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, অনুমোদিত নকশা পুরোপুরি লঙ্ঘন করে এবং পরিকাঠামোগত সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ চালানোর ফলেই এই মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটে।
গত ২৪ জুন তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডে নির্মীয়মাণ গুদামটি আচমকাই ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপ থেকে দীর্ঘ উদ্ধারকাজের পর ১৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ঘটনার তদন্তে নেমে শনিবার আদালতে যে চার্জশিট পেশ করেছে সিট, তাতে প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপারভাইজার, ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার-সহ ধৃত সাত জন অভিযুক্তের নাম রাখা হয়েছে। তবে চার্জশিটের মূল নির্যাস জুড়ে রয়েছে একের পর এক নিয়মভঙ্গ ও গাফিলতির তথ্য।
তদন্তে উঠে এসেছে, পুরসভার অনুমোদিত ব্লু-প্রিন্ট বা নকশার তোয়াক্কা না করেই বহুতল ওই গুদামের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছিল। পর্যাপ্ত শক্তির সামগ্রী ব্যবহারের বদলে অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ চলছিল। তদন্তের সমর্থনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের দেওয়া প্রযুক্তিগত রিপোর্টও যুক্ত করা হয়েছে চার্জশিটে। সেই রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং কংক্রিটের অতিরিক্ত ঢালাইয়ের চাপ সহ্য করতে না পেরেই লোহার মূল বিম বেঁকে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে গোটা পরিকাঠামো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।
সিটের বক্তব্য, এটি কেবল নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং আর্থিক লেনদেন ও নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়ে জেনেশুনে জীবন বাজি রাখার মতো অপরাধ। নির্মাণ তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে সুপারভাইজার ও ঠিকাদার— প্রত্যেকেই নিজেদের কর্তব্যে চরম গাফিলতি দেখিয়েছেন। প্রায় ৭০ জন সাক্ষীর বয়ান ও বিশেষজ্ঞদের প্রমাণের ভিত্তিতে অনিচ্ছাকৃত খুন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
















