রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসেও দখল বসাবে বিজেপি (BJP)। বারবারই তা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মমতার সেই সতর্কবাণীই এবার কার্যত বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। হাজী বিরিয়ানি থেকে আরসালান, বাঙালির স্বাদে-আহ্লাদে মুসলিম রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির (Biriyani) মাহাত্ম্য আজকের নয়। ধর্ম দেখে বিরিয়ানির দোকান খোঁজার ভাবনা কখনই ভাবায়নি বাঙালিকে। প্রথমে ভিনরাজ্যের এক সন্তকে এনে আমিষ বর্জনের নিদান দেওয়া হয়। তাতেও খুব একটা সুবিধা না হওয়ায় এবার বাঙালির সাধের বিরিয়ানিতেও নাক গলাচ্ছে সঙ্ঘ শিবির। পুজোয় বিরিয়ানি খান, তবে হিন্দু দোকান থেকে। পুজোর সামগ্রীও কিনুন হিন্দু দোকান থেকেই। শিলিগুড়ি (Siliguri) জুড়ে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের (Hindu Jagran Manch) এই পোস্টার ঘিরেই তুঙ্গে বিতর্ক।

আরও পড়ুন: জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে শিয়ালদহে AIDSO- র মিছিল, ভগবানপুরে আক্রান্ত SUCI

বিরিয়ানির দোকান বাছাই থেকে পুজোর কেনাকাটা, সবেতেই ধর্মের পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা। রবিবার সকালে শিলিগুড়ির বিভিন্ন এলাকায় এমনই কিছু পোস্টার চোখে পড়তেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। কোথাও বিরিয়ানি খাওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু দোকান বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কোথাও আবার পুজোর সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও একই আবেদন জানানো হয়েছে। আর এই বার্তা ঘিরেই উঠছে প্রশ্ন, ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়েও কি এবার ধর্মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি করা হচ্ছে?

আরও পড়ুন: দিঘায় পুজোর আনন্দ দ্বিগুণ! শান-অন্বেষার গানে জমবে সৈকত শহর

শহরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের একাংশের কথায়, এমন পোস্টার আগে তাঁদের চোখে পড়েনি। তাঁদের মতে, কে কোথা থেকে খাবার কিনবেন কিংবা পুজোর জিনিসপত্র সংগ্রহ করবেন, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এক বাসিন্দার কথায়, “কারও কোনও দোকান থেকে জিনিস কেনার ইচ্ছা হতেই পারে। সেখানে এভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়াটা ঠিক নয়।”

তবে পোস্টার ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনের শিলিগুড়ি মহানগর সংযোজক অভিষেক দাসের দাবি, শুধু দোকানদারদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রচার করা হচ্ছে না। মাদক থেকে শুরু করে অনলাইন প্রতারণার মতো বিভিন্ন বিষয়েও মানুষকে সচেতন করতে পোস্টার দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, অন্য বিষয়গুলিকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হিন্দু দোকান থেকে কেনাকাটার বার্তা নিয়েই অযথা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেবের বক্তব্য, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সেই দেশে এই ধরনের পোস্টার কতটা যুক্তিযুক্ত, তা সাধারণ মানুষেরই বিচার করা উচিত।

আরও কড়া ভাষায় এই প্রচারের বিরোধিতা করেছেন শিলিগুড়ির প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক অশোক ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করাই হিন্দু জাগরণ মঞ্চের রাজনীতির উদ্দেশ্য। কে কোথা থেকে কেনাকাটা করবেন, তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই বলেই মনে করেন তিনি। শিলিগুড়িতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের প্রসঙ্গ তুলে অশোকের প্রশ্ন, একইভাবে যদি মারওয়াড়ি কিংবা নেপালি দোকান থেকে জিনিস না কেনার ডাক দেওয়া হয়, তা হলে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ কী হবে? তাঁর দাবি, প্রশাসন অথবা যাঁরা এই পোস্টার লাগিয়েছেন, তাঁদেরই সেগুলি সরিয়ে ফেলা উচিত।

অন্যদিকে, হিন্দু জাগরণ মঞ্চের পোস্টারের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন বিজেপির জেলা সভাপতি অরুণ মণ্ডল। তাঁর দাবি, হিন্দু সনাতনী রীতি অনুযায়ী হালাল করা খাবার খাওয়া উচিত নয়। ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতিও জড়িয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গ টেনে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অরুণ।