গরিবের সস্তা খাবারেও এবার আকালের ছায়া! কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, করের প্রাণঘাতী খাঁড়া এবং চরম সরকারি উদাসীনতার জেরে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর প্রহর গুনছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেকারি শিল্প। যে শিল্প যুগ যুগ ধরে নামমাত্র মুনাফায় সাধারণ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের পাতে সুলভ মূল্যে পাউরুটি তুলে দিয়ে আসছে, আজ সেই শিল্পকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে প্রশাসনিক অপদার্থতা ও সরকারি বঞ্চনা।
কলকাতায় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স কো-অর্ডিনেশন কমিটি’-র বার্ষিক সম্মেলনে উঠে এল এমনই এক ভয়াবহ ছবি। রাজ্যের বেকারি শিল্পকে বাঁচাতে নতুন সরকারের কাছে কার্যত কাতর আর্জি জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বেকারস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক আরিফুল ইসলাম এবং সম্পাদক শেখ ইসমাইল হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে রাজ্যের প্রায় ৩ হাজার বেকারি ইউনিট চিরতরে ঝাঁপ ফেলতে বাধ্য হবে। আর তার জেরে কর্মহীন হয়ে পথে বসবেন এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত কয়েক লক্ষ শ্রমিক ও কর্মচারী!
সম্প্রতি পাউরুটির দাম সামান্য বাড়ানো হলেও তাতে শিল্পের প্রাণ বাঁচানো যাচ্ছে না। কারণ, প্যাকেজিং থেকে শুরু করে ময়দা, চিনি, ভোজ্য তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু এই চরম আর্থিক সঙ্কটের মুহূর্তে সরকার কোথায়? উল্টে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেকারি কনফেকশনারি সামগ্রীর উপর বসানো ৫ শতাংশ জিএসটি-র বোঝা! একদিকে লাগামহীন খরচের ধাক্কা, অন্যদিকে করের জুলুম— ছোট কারখানাগুলোর উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের গালভরা বুলি থাকলেও, বাস্তবে এই ক্ষুদ্র শিল্পগুলির জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনো আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা মিলছে না।
অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সরকারের কাছে ৭ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে বেকারি সংগঠন। তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত হলেও, প্রশ্ন উঠছে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বেকারি পণ্যের ওপর থেকে ৫ শতাংশ জিএসটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।পরিবেশবান্ধব আধুনিক যন্ত্রপাতি বসাতে সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।‘বেকারি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ গঠন ও সরকারি স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ল্যাবরেটরি তৈরি করতে হবে। মালিক ও শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পরীক্ষামূলকভাবে স্কুলের মিড-ডে মিল কর্মসূচিতে স্থানীয় বেকারিতে তৈরি পুষ্টিকর খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা আজ সুতোর ওপর ঝুলছে। খাদ্য নিরাপত্তার মতো একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় জড়িত থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক স্তরে এই চরম গা-ছাড়া মনোভাব কেন? সরকার কি তবে চাইছে বাংলার বুক থেকে ঐতিহ্যবাহী এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পটি পুরোপুরি মুছে যাক? বেকারি শিল্পকে বাঁচাতে হলে ফাঁকা বুলি বা প্রতিশ্রুতির ফানুস নয়, অবিলম্বে চাই সরকারের সদর্থক ও কার্যকরী হস্তক্ষেপ। নইলে বাংলার বেকারি শিল্পের এই মৃত্যুঘণ্টার দায় সরকার ও প্রশাসনকেই নিতে হবে!