আকাশে-বাতাসে শারদোৎসবের আবহ। পাড়ায় পাড়ায় আলোর রোশনাই, আগমনীর সুরে মেতে উঠেছে বাংলা। আর কয়েক দিন পরেই মহালয়া, দেবীপক্ষের সূচনা হতে চলেছে। কিন্তু গোটা রাজ্য যখন ঘরের মেয়ে উমার বরণে মাতোয়ারা, তখন চন্দননগরের হরিদ্রাডাঙার পূর্বপাড়ার পাটারি পরিবারের অন্দরমহল ঢেকে রয়েছে গভীর বিষাদের অন্ধকারে। চারদিকের উৎসবের আলো এই বাড়ির থমথমে পরিবেশকে আরও যেন ম্লান করে দিচ্ছে। এক মাস পেরিয়ে গেলেও নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিখোঁজ গৃহকর্ত্রী বাড়ি ফেরেননি। বৃদ্ধা মায়ের ঘরে ফেরার পথ চেয়েই এখন দিন গুনছে গোটা পরিবার।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, নিখোঁজ বৃদ্ধার নাম শিপ্রা রায় পাটারি। বয়স ষাটের কোঠায়। সিঙ্গুরের গোলাপমোহিনী বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা তিনি। স্বামী রবীন পাটারিও চুঁচুড়ার গড়বাটি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক। গত ২১ অগাস্ট কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার উদ্যোগে ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলেন শিপ্রা। সফরসূচি অনুযায়ী ৬ সেপ্টেম্বর তাঁদের বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় চরম বিপর্যয়। গত ২৬ অগস্ট আচমকা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে নেপালে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই দুর্যোগের পর থেকেই আর খোঁজ মিলছে না তাঁর। পরিবারের অনুমান, ঘটনার দিন সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ইমিগ্রেশন কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকাতেই তিনি অবস্থান করছিলেন। তার পর থেকেই নিখোঁজ।

শিপ্রা এবং রবীনের দুই ছেলে, নিলয় ও অনীক। বড় ছেলে নিলয় আমেরিকার একটি কলেজের অধ্যাপক। ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ আগেই সেখানে কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২৬ অগাস্ট দুর্যোগে মায়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়েই তড়িঘড়ি সব ফেলে দেশে ফিরে আসেন। এর পর গত ২ সেপ্টেম্বর দুই ভাই একসঙ্গে নেপালে ছোটেন মায়ের সন্ধানে।

নিখোঁজ শিক্ষিকার দেওর বাবলু পাটারি জানান, তাঁর দুই ভাইপো নেপালে গিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে এবং স্থানীয় প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরেও মায়ের কোনও সন্ধান পায়নি। এর পর নেপাল পুলিশের তরফে পরিচয় নিশ্চিত করতে দুই ভাইয়ের লালারসের নমুনা সংগ্রহ করা হয় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য। পরবর্তী সময়ে দমদম বিমানবন্দরে রাজ্য সরকারের উদ্যোগেও তাঁদের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছিল। নেপাল সরকারের পাঠানো প্রাথমিক রিপোর্টে অবশ্য উদ্ধার হওয়া কোনও দেহের সঙ্গে শিপ্রা রায় পাটারির ডিএনএ মেলেনি। ফলে আশার আলোটুকু এখনও জিইয়ে রেখেছেন পরিজনেরা। রাজ্য সরকারের আধিকারিকদের সঙ্গে পরিবারের তরফে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে।

তবে এই সংকটের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগে পড়েছে পরিবারটি। বড় ছেলে নিলয়ের আমেরিকার ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। মায়ের খোঁজে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরে এলেও এখন ফিরে যাওয়ার জন্য ভিসার কোনও স্লট পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য দিকে, আমেরিকার যে কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন, সেখান থেকেও দ্রুত কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মহালয়ার প্রাক্কালে পাটারি বাড়ির পরিবেশ এখনও ভারী ও নিস্তব্ধ। বাবলু পাটারির কথায়, দেবী দুর্গার আগমন ঘটছে। মায়ের কাছে আমাদের একটাই প্রার্থনা, যে ভাবেই হোক বৌদি যেন ফিরে আসেন। ভাইপোরা যেন তাদের মাকে ফিরে পায়। অন্তত একটা নিশ্চিত খবর পাওয়া যাক। উমার আবাহনে যখন গোটা শহর সেজে উঠছে, তখন চন্দননগরের এই পরিবারের প্রার্থনা একটাই— ঘরের মা ফিরলেই তবে পাটারি বাড়িতে জ্বলে উঠবে আসল আলোর দীপ।