ইতিহাস কি এভাবে মুছে ফেলা যায়? উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ ভবনের 'তিতুমীর সভাকক্ষ'-এর নাম পাল্টে 'শ্যামাপ্রসাদ ভবন' করা নিয়ে এখন সেই প্রশ্ন। বুধবার হিন্দু জাগরণ মঞ্চের ‘অখণ্ড ভারত সংকল্প’ সপ্তাহের কর্মসূচিতে সভাকক্ষের নাম পাল্টানো হয়। এছাড়াও দেওয়ালে টাঙানো ইংরেজদের বিরুদ্ধে তিতুমীরের লড়াইয়ের ছবিও সরিয়ে সেখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি টাঙানো হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
ফের নাম পরিবর্তনের রাজনীতি! বারাসতে জেলা পরিষদের সভাকক্ষে তিতুমীরের নাম মুছে শ্যামাপ্রসাদ ভবন
Sponsored

এর আগে বীরভূমের রামপুরহাটে নেতাজির নাম পরিবর্তন করে শ্যামাপ্রসাদের নাম করা হয়েছিল। পরে অবশ্য চাপের মুখে ফের নাম বদলাতে হয় বিধায়ককে। এবার তিতুমীর। বিষয়টি শুধু নাম পরিবর্তনের নয়, আছে চতুরভাবে স্থানীয় ইতিহাস মোছার চেষ্টা। ১৯৮৬ সালের ২৬ জুন অবিভক্ত ২৪ পরগনা ভাগ হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা তৈরি হয়। তারপর উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদও নতুনভাবে তৈরি হয়। সেই সময় থেকেই জেলা পরিষদের সভাকক্ষটি বাদুড়িয়ার ভূমিপুত্র তিতুমীরের নামে করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের একজোট করে নীলবিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন তিতুমীর। নারকেলবেড়িয়ায় তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয় ‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’। ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সেই প্রতিরোধ আজও বাংলার ঔপনিবেশিক-বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে জেলা পরিষদের একটি সভাকক্ষ থেকে তিতুমীরের নাম এবং ছবি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিছক প্রশাসনিক নামবদল হিসেবে দেখতে নারাজ ইতিহাস-সচেতন মহলের একাংশ।
বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে, তিতুমীরের নাম মুছে ফেলতেই হবে কেন? শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলার এবং ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব—এ নিয়ে বিতর্ক নেই। তাঁর নামে নতুন কোনও ভবন বা সভাকক্ষের নামকরণ করতেই হলে তা করা যেত। কিন্তু তার জন্য বাংলার ঔপনিবেশিক-বিরোধী সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক চরিত্রের নাম-ছবি সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
হিন্দু জাগরণ মঞ্চের নেতা সঞ্জীব মাহাতো নামবদলের রাজনৈতিক সাফাই দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও ‘হিন্দু সমাজের সামাজিক জয়’ এখনও হয়নি এবং ‘অখণ্ড ভারত’-এর সংকল্প সামনে রেখেই তিতুমীর সভাকক্ষের নাম বদলে শ্যামাপ্রসাদ ভবন করা হয়েছে। বিজেপির তরফেও নামবদলের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। বারাসত সাংগঠনিক জেলা বিজেপির আইনজীবী সেলের কনভেনর নিমাই রায়ের দাবি, দেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তিতুমীরের তুলনায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান বেশি। এই দাবিকে ঘিরেও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিতুমীরের সশস্ত্র কৃষক প্রতিরোধ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভূমিকা—দুইয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদা। দু’জনের ভূমিকা, সময়কাল এবং রাজনৈতিক পরিসরও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তবে বারাসতের মাটি থেকে তিতুমীরের স্মৃতি মুছে ফেলার এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটাই দেখার।
সিপিআইএমের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, "মিটিং করার নাম করে তিতুমীরের নামাঙ্কিত জায়গা থেকেই দুটো ছবি ভেঙে বাইরে ফেলে দিয়েছে। প্রসাশন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কর্মচারীরা আপত্তি জানিয়েছে। সেই অপরাধে তাঁকে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। যারা আসলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে তাঁদের নাম-ই মুছে দিতে চাইছে। আর মুসলমান নাম হলে তো কোনও অসুবিধা নেই। এই জন সম্রাট অন্যজন ফকির। পলাশির যুদ্ধের পড়ে একমাত্র রাজা টিপুর বাবা হায়দার আলি তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়ে হারিয়েছিল। এই ইতিহাসকে ওরা বিকৃত করতে চায়। যখন মধ্যবিত্তরা স্বাধীনতা আন্দোলনে নামেনি তখন এক সম্রাট আর এক ফকির লড়েছিল।"
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored

More from রাজ্য
View All →
ভরদুপুরে চম্পাহাটিতে বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ! গুরুতর জখম ৫
5h ago

ব্যাঙ্ক মনে হয় অভিষেকের মুখ দেখতে চাইছে! অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় তীব্র ভর্ৎসনা হাই কোর্টের
5h ago

রক্তের কালোবাজারি রুখতে কড়া নির্দেশিকা, সব বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ককে তলব স্বাস্থ্যভবনের
6h ago

এআই ব্যবহারে 'ডিপফেক' ভিডিও-অডিও ক্লিপ! টিভি চ্যানেলগুলির বিরুদ্ধে মামলা-আইনি নোটিশ কীর্তির
6h ago

কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার ১, আটক আরও ২
7h ago







