‘তৃণমূল কারও বাপের সম্পত্তি নয়’— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ঘিরেই এবার তীব্র আক্রমণ তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের (Trinamool MLA Kunal Ghosh)। শনিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রতের এই মন্তব্যের সূত্র ধরে কুণালের কটাক্ষ, যে দলের নেতৃত্ব, প্রতীক এবং দীর্ঘ আন্দোলনের উপর দাঁড়িয়ে এতদিন ঋতব্রত সহ তাঁর শিবিরের বেশিভাগের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে, সেই দলকেই এখন এভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে! তবে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করেননি তিনি। কুণালের নিশানায় শুধু ঋতব্রত নন, ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) ও অরূপ বিশ্বাসও (Arup Biswas)।
কুণালের বক্তব্য, তৃণমূল কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় ঠিকই, কিন্তু এই দলের জন্মের ইতিহাসকে অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সিপিএমের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন এবং কর্মী-সমর্থকদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই তৃণমূল তৈরি হয়েছে। ‘জোড়াফুল’ প্রতীককে বাংলার মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও মমতার ভূমিকার কথা তুলে ধরে কুণালের প্রশ্ন, “একবারও কি মমতাদির মুখটা মনে পড়ছে না?” তাঁর দাবি, আজ যাঁরা তৃণমূলের অস্তিত্ব ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের রাজনৈতিক উত্থানের পিছনেও রয়েছে এই দল এবং তার নেতৃত্বের অবদান। ফলে তৃণমূল কারোর বাপের সম্পত্তি নয় কারণ তৃণমূল মায়ের সম্পত্তি।
ঋতব্রতকে নিশানা করে কুণাল আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, যাঁরা একটা সময়ে তৃণমূলে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন দলকে নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন। তাঁর অভিযোগ, “একজন গায়ককে দিয়ে ফোন করিয়ে, অভিষেকের পায়ে পড়ে” তৃণমূলে জায়গা করে নিয়েছিল ঋতব্রত আর আজ সেই দলের বিরুদ্ধেই ‘কারও বাপের সম্পত্তি নয়’ মন্তব্য করা হচ্ছে। কুণালের কটাক্ষ, তৃণমূলে ঢুকে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে পরে সেই দলকেই বিজেপির হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর প্রশ্ন, “রাজনীতি আর কোথায় নামবে?”
এদিন ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাসকেও সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করান কুণাল। তাঁর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যাঁরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তাঁদেরই আগে এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। ফিরহাদের কাউন্সিলর থেকে মেয়র, মন্ত্রী হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ তুলে কুণালের প্রশ্ন, “তোমাদের জীবনে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ফোঁটা অবদান থাকে এবং শরীরে যদি মানুষের রক্ত থাকে, তাহলে ‘তৃণমূল কারও বাপের সম্পত্তি নয়’—এই প্রতিবাদটা সবার আগে তোমাদের মুখ থেকে আসা উচিত।” অরূপ বিশ্বাসকেও একই বার্তা দেন তিনি।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে শুরু করে সিপিএম-বিরোধী দীর্ঘ লড়াই এবং ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার ইতিহাসও তুলে ধরেন কুণাল। তাঁর দাবি, এই দল তৈরি হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে, আর বাংলার মানুষ সেই দলকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছেন। ফলে এখন যাঁরা বিজেপির দিকে গিয়ে তৃণমূলের প্রতীক ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের উদ্দেশে কুণালের চ্যালেঞ্জ, “দম থাকলে আলাদা দল করুন, আলাদা প্রতীক নিন, মানুষের কাছে গিয়ে ভোট চান।”
একইসঙ্গে দলবদলু নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কড়া আক্রমণ শানিয়েছেন কুণাল। তাঁর দাবি, বিজেপি পাশে দাঁড়ালেও মানুষের দরবারে তাঁদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা শেষ। তাঁর কথায়, “বিজেপি কোলে বসিয়ে রাখলেও মানুষের দরবারে তোমাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ।” ফলে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে চলা বিতর্কের মধ্যেই ‘তৃণমূল কারও বাপের সম্পত্তি নয়’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দলের অন্দরের রাজনৈতিক সংঘাত যে আরও প্রকাশ্যে চলে এল, কুণালের এদিনের বক্তব্যে তা স্পষ্ট।
















