পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে দুধ গরম করতে গিয়ে পুরমন্ত্রীর ধমক খাওয়া, তার পর সমাজমাধ্যমে ঝড়, তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি— গত কয়েক দিনে ঘটনাপ্রবাহ গড়িয়েছে দ্রুত গতিতে। কিন্তু কলকাতা পুরসভার ঠিক করে দেওয়া আশ্রয়ে শেষমেশ ঠাঁই হল না ফুটপাতবাসিনী সীতা ওরফে রশিদার। পুরসভার আশ্রয়স্থলে থাকতে নারাজ হওয়ায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারের বাকিদের শেষ পর্যন্ত দলের সংখ্যালঘু সেলের এক নেতার বাড়িতে রাখার বন্দোবস্ত করেছে বিজেপি। অন্য দিকে, মায়ের খোঁজ না পেয়ে পুরসভার আশ্রয়স্থলেই চোখের জল ফেলছেন সীতার বড় মেয়ে।

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে সীতাকে কেরোসিনের স্টোভে দুধ গরম করতে দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। পাশেই একটি শিশু থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রীর ওই আচরণের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এর পরই তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ থানায় গিয়ে ফুটপাতবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানান। সমাজমাধ্যমে পুরমন্ত্রীর পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, ওই পরিবারের দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন। পাল্টা আসরে নামেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।

রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই মঙ্গলবার সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’ কর্মসূচিতে পৌঁছন সীতা। সেখানে মমতার চক্করে না পড়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে সপরিবার পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই মতো সীতাদের থাকার বন্দোবস্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কলকাতা পুরসভাকে। 

কিন্তু তার পরেই তৈরি হয় জটিলতা। উত্তর কলকাতার বেলেঘাটায় পুরসভা ও জাতীয় নগর জীবিকা মিশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল ‘আশ্রয়’-এ নিয়ে যাওয়া হয় সীতার বড় মেয়ে পূজা বিশ্বাসকে। পূজার দাবি, মঙ্গলবার সকালে পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাত থেকে মা, বোন এবং বোনের দুই নাবালক সন্তানকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, বাকিদেরও বেলেঘাটায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে মা ও বোনের দেখা পাননি তিনি। নিজের ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে আসায় এবং পরিবারের লোকেদের হদিশ না পেয়ে আশ্রয়স্থলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন অসুস্থ পূজা।

আশ্রয়স্থলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে সীতাদের সেখানে নিয়ে এলেও তাঁরা গাড়ি থেকে নামতেই অস্বীকার করেন। তার আগে রাজা রামমোহন সরণির অন্য একটি আশ্রয়স্থলেও তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখানেও কয়েক মিনিট থেকেই বেরিয়ে আসেন তাঁরা। পুর আধিকারিক কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে সীতাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো না গেলেও শেষ পর্যন্ত বিজেপির তরফে বিষয়টি খোলসা করা হয়।

বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ জানান, পুরসভার আশ্রয়স্থলে সীতা ও তাঁর পরিবার থাকতে চাননি। ফলে দলের তরফে দক্ষিণ কলকাতায় সংখ্যালঘু সেলের এক নেতার বাড়িতে তাঁদের থাকার সাময়িক ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপদেই রয়েছেন। দলীয় স্তরে তাঁদের স্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। রাজনৈতিক সংঘাত আর পুনর্বাসনের আশ্বাসের টানাপোড়েনে বুধবারও পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে পড়ে রইল সীতার ভাঙা সংসারের কেরোসিনের স্টোভ আর বিছানাপত্র, আর পরিবারের সদস্যরা আপাতত রইলেন ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায়।