সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবতের(Mohan Bhagwat )  নিউ ইয়র্কের সভার বক্তব্য নিয়ে ভারতে চলছে কাটা ছেঁড়া। মূলত দুটি মত উঠে এসেছে সমালোচনা, পালটা সমালোচনায়। এক পক্ষের বক্তব্য, ভাগবত পুরোটাই নাটক করছেন। তাঁর মনে এক বিশ্বাস আর কাজে আর এক। আমেরিকায় গিয়ে উদারতার কথা শুনিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। অন্য পক্ষের বক্তব্য হল, সঙ্ঘ প্রধানের কথা যদি মেনেই নিই, তাহলে ভারতে ফিরে মোদি-শাহকে আগে নতুন করে দীক্ষা দেওয়া উচিত। কারণ তাদের পুরনো দুই স্বেচ্ছাসেবক ধর্মকে সামনে রেখে যেভাবে  ভারতকে টুকরে টুকরে করতে নেমেছেন, তা দেশের কাছে কলঙ্কজনক।

 

আমেরিকার ম্যানহ্যাটনে গিয়ে মোহন ভাগবত কী বললেন? আসলে এই সভা নিয়ে শুরু থেকেই কম বিতর্ক হয়নি। ভাগবতের এই কর্মসূচিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানি। স্পষ্ট বলেছিলেন, আমি এই কর্মসূচিকে সমর্থন করি না। তবে কর্মসূচি বাতিল করে দেওয়ার এক্তিয়ারও নিউইয়র্কের মেয়রের নেই। মামদানির বিরোধিতার কারণ কী? অবস্থান পরিস্কার করে তিনি বলেছিলেন, আমার পরিবার আমাকে ভারত সম্পর্ক যে ধারণা দিয়েছে বা যে ধারণা নিয়ে আমি বড় হয়েছি, তা হল— এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বহুত্ববাদী সমাজ। যে সমাজ ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেককে সঙ্গে নিয়ে চলে। কিন্তু সেই সমাজ থেকে কাউকে দূরে সরিয়ে রাখার দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনের উত্থান দেখা আমার পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ম্যানহ্যাটনের ম্যাডিসন স্ক্যোয়ারের সভায় টানা এক ঘন্টা বক্তৃতা করেন মোহন ভাগবত। সভার আয়োজক ছিল আমেরিকান হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ।  বিষয় ছিল ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন। ভারতে বহজাতিক সংস্কৃতির কথা বারবার উঠে আসে তাঁর আলোচনায়। যা আসলে বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্যের ভাবনা। তিনি বলেন, কোনও হিন্দু যদি ভাবেন মুসলিমদের ভারতে থাকা উচিত নয়, তবে সেই ব্যক্তি আসলে হিন্দুই নন। আমি এবং আমার ভাবনা থেকে কোনও সমাধান হয় না। সমাধান আসে আমরা এবং আমাদের চিন্তাধারা মধ্য দিয়েই। বৈচিত্র‍্যই ভারতের আধার। মানুষের মজ্জায় মিশে রয়েছে। সেই জন্যই গোটা বিশ্বকে ভারত বলতে পারে, বিশ্ব জুড়ে যে বৈচিত্র‍্য দেখা যায়, ভারতেই তা রয়েছে। এই অবস্থাকেই আমাদের সম্মান জানাতে হবে, ধরে রাখতে হবে। 

ভাগবতের এই মন্তব্যে ব্যাপক ক্ষুন্ধ কংগ্রেস। কপিল সিব্বাল বলেছেন, দেশের বাইরে গিয়ে এইসব ভাল ভাল কথা বলতে ভালই লাগে। দেশে থাকার সময় কোনও ঘটনা যখন ঘটে, তখন মুখে কুলুপ এঁটে কেন বসে থাকেন? মুসলিমদের প্রকশ্যে বলছে এটা তোমার দেশ নয়। বলা হচ্ছে হিন্দুত্বই দেশের সংস্কৃতি। লাভ জিহাদ থেকে জোর করে ধর্মান্তকরণ চলছে। কে কোন পোশাক পরবে বা কী খাবে, সেটাও ঠিক করে দিচ্ছে বিজেপি। এই বিজেপির দুই মাথা সহ বিভিন্ন পদে রাষ্ট্রীয় সংঘের লোকজন। তারপরেও যখন এইসব ঘটনা ঘটে, তখন কোথায় থাকে সঙ্ঘের প্রতিবাদ? আপ নেতা সঞ্জয় সিং বলেন, এরা সব নাটকের দল। এদের পূর্বপুরুষরা ৫০ বছরের বেশি সময় ওদের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা তোলেনি। স্বাধীনতা নিয়ে নানা জ্ঞানগর্ভ কথা বলে। অথচ এরা দেশের স্বাধীনতাই চায়নি। চেয়েছিল ইংরেজদের পদলেহন। ওদের কাছে হাঁটুগেড়ে বসে স্বধীনতা যোদ্ধাদের পিঠে ছুরি মেরেছে। এখন যাই-ই বলুক বুঝতে হবে বিজেপি সরকারকে গ্লোরিফাই করতেই এসব কাহানি ফাঁদছে। বাম নেতা এম এ বেবি বলেছেন, এত লুকনোর কী আছে। বিজেপি আর সঙ্ঘ হচ্ছে মুখ আর মুখোশ। যখন যাকে প্রয়োজন হয় সে নিজেকে ব্যবহার করে, অন্যজন মুখোশের আড়ালে থাকে। ভারতের হৃদস্পন্দন হল বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্য। বিজেপি এটাই বদলে দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে চায়। যাতে মোহন ভাগবতরা পিছন থেকে মদত দিচ্ছে। এরা আম্বেদকরের তৈরি সংবিধান বদলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান লিখতে চায়। তার জন্যেই এই আগ্রাসী ভূমিকায় নেমেছে। সকলকে নিজেদের তাঁবুতে আনতে চাইছে। এই হিটলারীয় মনোভাব দেশের মানুষ মেনে নেবে না।

অনেকে আবার এর বাইরে হেঁটে বলছেন, বাইরে গেলে ভাল কথা বলতে হয়, তাই বলছেন। সকলে জানে যাহা সঙ্ঘ, তাহাই বিজেপি। আসলে ভোটের আগে মোদি-শাহ যে আবর্জনা জমিয়েছেন, তার সাফাই অভিযানেই ভাগবতের এই বিদেশ সফর।