একসময় হাতেগোনা কয়েকজন মিলে শুরু করেছিলেন পুজোটা। বর্তমানে ৪০ পরিবারের উদ্যোগে বার্মিংহাম সোশ্যাল এন্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (Birmingham Social and Cultural Organisation) পুজো বলা চলে ঘরের পুজো, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে শিকড়ের যোগসূত্রে বার্মিংহামের ভিলেজ হলে এবছরও শারদোৎসবের আয়োজনের ব্যস্ততা বেশ তুঙ্গে। এই পুজো সম্পর্কে শোনা যায় ছোট্ট পরিসরে কয়েকজনের উদ্যোগে যে দুর্গাপুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা আজ প্রায় ৪০টি পরিবারের এক নিবিড় সামাজিক বন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রবাসের মাটিতে থেকেও বাঙালির চেনা সাবেকিয়ানাকে ধরে রাখাই যেন এই পুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার শারদৎসবের একাধিক স্মৃতি। পুজো কমিটির জন্য কলকাতা থেকে বাঁকে বিহারি অনন্ত ঘোষ দুর্গাপ্রতিমা দান করেছিলেন। সেই প্রতিমাকে ঘিরেই প্রবাসে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ আবেগ ও ঐতিহ্য। ঝলমলে আধুনিক আয়োজনের পাশাপাশি সাবেকি রীতিনীতি ও পরম্পরাকে গুরুত্ব দেওয়াই এই পুজোর স্বাতন্ত্র্য।প্রতি বছরই পঞ্জিকা মেনে নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠীর বোধন থেকে শুরু করে দশমীর সিঁদুর খেলা প্রতিটি পর্বেই থাকে বাঙালির চেনা আবেগ, আচার ও উৎসবের ছোঁয়া। পুজোর পাশাপাশি থাকছে ভোগ বিতরণ ও খাবারের ব্যবস্থাও। ফলে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, পুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতদের মিলনমেলা।
প্রবাসে দুর্গাপুজো অনেক সময়ই হয়ে ওঠে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি উপলক্ষ। সেই জায়গা থেকেই এই পুজোকে তৈরী করেছেন উদ্যোক্তারা। পুজো কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তা আলোক চন্দের কথায়, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য শুধু দুর্গাপুজো করা নয়; এর মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা এবং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো। পুজোর দিনগুলিতে ছোটদের অংশগ্রহণ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বাঙালির বিভিন্ন রীতিনীতি কাছ থেকে দেখা,সব মিলিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের শিকড়ের গল্প পৌঁছে যায়।
পুজো কমিটির চেয়ারম্যান সিঙ্কু দাস এবং ডা. অমিতবিক্রম দেব-সহ কমিটির সদস্যদের কাছেও এই পুজো নিছক একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়। তাঁদের কাছে এটি যেন বার্মিংহামের মাটিতে তৈরি একটি ‘ঘরের পুজো’ যেখানে প্রত্যেক পরিবার নিজের মতো করে অংশ নেয়, দায়িত্ব ভাগ করে নেয় এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।
প্রবাসে পুজোর আয়োজন সহজ নয়। সময়, কাজ, পরিবার ও নানা দায়িত্বের মধ্যে থেকেও প্রত্যেক বছর সবাইকে একত্রিত করার এই প্রয়াসই এই পুজোর অন্যতম শক্তি। চার দশক নয়, চারটি দশক পেরোয়নি তবু ৪০ পরিবারের এই সম্মিলিত উদ্যোগে যে আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে, সেটিই এই আয়োজনের আসল সম্পদ।
এই দুর্গোৎসব তাই শুধু দেবী আরাধনার অনুষ্ঠান নয়। এটি প্রবাসে বসে বাংলার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস, পরিবারগুলিকে এক সুতোয় বাঁধার আয়োজন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার এক আন্তরিক উদ্যোগ। ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধ, অঞ্জলির মন্ত্র আর দশমীর সিঁদুর খেলায় বার্মিংহামের মাটিতেও যেন কয়েক দিনের জন্য ফিরে আসে এক টুকরো বাংলা একেবারে নিজের ঘরের মতো।















