বছরের পর বছর কেটে যায়, বদলে যায় সময়, বদলে যায় প্রজন্ম। কিন্তু শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে উঠলেই প্রবাসী বাঙালির মন যেন ফিরে যায় সেই বাংলায়। কাশফুলের দোলা, ঢাকের আওয়াজ, ধুনোর গন্ধ আর মায়ের মুখ সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো শুধু একটি উৎসব নয়, বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিকেই বিদেশের মাটিতে বছরের পর বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে লন্ডন শারদোৎসব।

লন্ডনের গুনার্সবেরি পার্কে আয়োজিত এই পুজো আজ শুধু একটি দুর্গাপুজো নয়, ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ দুর্গোৎসব হিসেবে প্রবাসী বাঙালির ক্যালেন্ডারে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। আগামী ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর গুনার্সবেরি স্পোর্টস ক্লাবে ফের বসবে সেই চেনা মিলনমেলা। তিন দিন ধরে উৎসবের আবহে মুখরিত হবে গোটা এলাকা। বকুলতলা, রঙ্গমঞ্চ, ঠাকুরদালান সবকিছুর সমন্বয়ে বিদেশের মাটিতেই যেন তৈরি হবে এক টুকরো বাংলা। এখানে পুজো মানেই শুধু প্রতিমা দর্শন নয়, এখানে মিশে থাকে ঘরের টান, পুরনো দিনের স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস। মহাষষ্ঠীর বোধন থেকে শুরু করে পঞ্জিকা মেনে পুজোর সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান অঞ্জলি, ধুনুচি নাচ, আরতির আবহে তিনদিন ধরে চলবে উৎসব। প্রবাসে থেকেও যাতে বাঙালি তার উৎসবের স্বাদ, গন্ধ ও ঐতিহ্যকে অনুভব করতে পারে, সেই চেষ্টাই লন্ডন শারদোৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আরও পড়ুন: পুজোর আগেই বর্ষার বিদায় নিলেও বৃষ্টি থেকে রেহাই নেই! জানুন আবহাওয়ার আপডেট

এবারের আয়োজনেও রয়েছে বিশেষ চমক। দূরদর্শনের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে লন্ডন শারদোৎসবের মঞ্চে থাকছে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন। তিনদিন-তিনরাতের এই মহোৎসবে অংশ নেবেন সাধারণ প্রবাসী বাঙালি থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। বাংলার সংস্কৃতি, গান, অভিনয় ও বিনোদনের নানা রঙে সাজবে উৎসবের প্রতিটি সন্ধ্যা। আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে ‘ঠাকুমার ঝুলি’-র বিশেষ পরিবেশনা। পাশাপাশি ‘লন্ডনে গপ্প’ ও ‘গপ্প মিরের ঠেক’-এর মতো অনুষ্ঠানও দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে গল্প, আড্ডা আর বাঙালিয়ানার সেই চেনা জগতে। বিভিন্ন ভারতীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও উৎসবের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে।

এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। সুরঞ্জন সোম , সৌরভ নিয়োগী, অনামিকা-সহ একাধিক উদ্যোক্তা ও সংগঠকের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতি বছর এই উৎসব আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাঁদের কাছে এই পুজো কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রবাসে বাঙালির অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এক দায়বদ্ধতা। লন্ডন শারদোৎসব তাই বয়সের সীমা মানে না। এখানে যেমন থাকেন বহু বছর ধরে ব্রিটেনে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালিরা, তেমনই ভিড় করেন নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণী ও শিশুরা। কারও কাছে এটি শৈশবের পুজোর স্মৃতি, কারও কাছে নতুন করে নিজের সংস্কৃতিকে আবিষ্কারের সুযোগ। আর মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে দূরত্ব মুছে যায় লন্ডন আর কলকাতা যেন এক হয়ে যায়।

উৎসবের আবহকে আরও বর্ণময় করে তুলতে সহযোগী হিসেবে থাকছে একাধিক পরিচিত প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড এইচডিএফসি, এসবিআই, উডল্যান্ডস হসপিটাল, অ্যাডামাস নলেজ সিটি, হালদিরামস-সহ আরও অনেকে। তাঁদের সহযোগিতায় প্রবাসের এই বৃহৎ দুর্গোৎসব আরও ব্যাপক পরিসর পাচ্ছে। গুনার্সবেরি পার্কে যখন ঢাক বাজবে, ধুনোর ধোঁয়া উঠবে আর মায়ের আরতির আলোয় আলোকিত হবে ঠাকুরদালান, তখন কয়েক হাজার মাইল দূরের বাংলার সঙ্গে যেন তৈরি হবে এক অদৃশ্য সেতু। কারণ দুর্গাপুজো আসলে ঠিকানা মানে না। মায়ের আগমন যেখানে, সেখানেই তো বাঙালির ঘর।লন্ডন শারদোৎসব সেই ঘরটাকেই প্রতি বছর নতুন করে সাজিয়ে তোলে বিদেশের মাটিতে, বাঙালির ভালোবাসায়, মায়ের আশীর্বাদে।