মাঝ আকাশে আচমকাই বদলে গিয়েছিল বিমানের পরিবেশ। ককপিটের ভিতর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ। কী ঘটছে, প্রথমে বুঝতে পারেননি যাত্রীরা। কিন্তু মাত্র ছ’বছরের একটি শিশুর আতঙ্কিত চিৎকারেই প্রকাশ্যে আসে ভয়াবহ ঘটনা। দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর (Flydubai Flight) বিমানে সহকারী পাইলটের হাতে আক্রান্ত হন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর (Captain Smit Machhar)। গুরুতর আহত অবস্থাতেও বিমানের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে দেননি তিনি। পরে যাত্রীদের তৎপরতা এবং দুই অফ-ডিউটি পাইলটের সহযোগিতায় নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুকে বিমান অবতরণ করানো হয়।

আরও পড়ুন: সিজেপির আন্দোলন মঞ্চ কানায় কানায় পূর্ণ! বিশিষ্ট শিল্পীরাও তুললেন জ্ঞানেশ হটানোর আওয়াজ

ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ইজরায়েলের ব্যাঙ্ক লিউমির সিইও টিজিভিকা মানেস এবং তাঁর পরিবার। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মানেস জানিয়েছেন, তাঁর ছ’বছরের মেয়ে নিনার (Nina) একটি চিৎকারই কার্যত পরিস্থিতি সকলের সামনে নিয়ে আসে। বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ বিমানটি দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা দেয়। স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে উড়েছিল বিমানটি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত সব কিছু স্বাভাবিকই ছিল। বিমানটি তখন প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায়। সেই সময়েই ককপিটের ভিতরে প্রধান পাইলট স্মিত মচ্ছরের উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন: ককপিটে প্রাণঘাতী হামলা! আতঙ্কের রোমহর্ষক বর্ণনা স্মিতের স্ত্রীর মুখে

মানেসের বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানের একেবারে সামনের দিকে তাঁর পরিবার বসেছিল। মা টালি মানেসের সঙ্গে শৌচালয়ে গিয়েছিল ছোট্ট নিনা। শৌচালয়ের কাছেই ছিল ককপিট। সেখান থেকেই সে জোরে জোরে কথা কাটাকাটির শব্দ শুনতে পায়। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক বুঝতে পেরে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সে। আতঙ্কে বাবাকে উদ্দেশ করে চিৎকার করে বলে, ‘‘বাবা, আমরা মরতে চাই না।’’ মেয়ের চিৎকার শুনে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন মানেস। অনেকবার ধাক্কা দেওয়ার পর কোন মতে ককপিটের দরজা খুলতে দেন স্মিত মচ্ছা। এরপরেই কাছে পৌঁছে মানেস দেখতে পান, প্রধান পাইলট রক্তাক্ত অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ, তার আগেই ককপিটের ভিতরে সহকারী পাইলট তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিক বার আঘাত করেছিলেন।

মানেস জানিয়েছেন, কোনও মতে ককপিটের দরজা ফাঁক করে বাইরে আসেন স্মিত। সেই সময়ও অভিযুক্ত সহকারী পাইলট তাঁর উপর হামলা চালাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বুঝে মানেস আরও দুই যাত্রীকে নিয়ে অভিযুক্তকে চেপে ধরেন। তাঁর হাত ইয়ারফোনের তার দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়।

এর মধ্যেই বিমানের ভিতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, প্রধান পাইলট গুরুতর আহত হওয়ার পর বিমানটি দ্রুত নীচের দিকে নামতে শুরু করেছিল। মানেসের কথায়, সেই মুহূর্তে বিমানের ভিতরের পরিস্থিতি যেন ‘ভূতের সিনেমার’ মতো হয়ে উঠেছিল।

তবে বিপদের মুহূর্তে এগিয়ে আসেন আরও দুই পাইলট, যাঁরা তখন যাত্রী হিসেবে বিমানে ছিলেন। তাঁরা ‘অফ ডিউটি’ থাকলেও নিজেদের উড়ান-অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। তাঁদের সহায়তায় বিমানটির নিয়ন্ত্রণ সামলে নেওয়া সম্ভব হয়। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে বিমানটি। বিমান অবতরণের পর আহত স্মিতের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়। বিমানে থাকা এক চিকিৎসক যাত্রীও তাঁর চিকিৎসায় সাহায্য করেন বলে জানা গিয়েছে। পরে তাঁকে আরও চিকিৎসার জন্য দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাবুকে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ফ্লাইদুবাইয়ের তরফে একটি বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করা হয়। সেই বিমানেই তেল আবিবে পৌঁছন যাত্রীরা। মাঝ আকাশের সেই আতঙ্কের ঘটনায় তাই ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের পাশাপাশি ছোট্ট নিনার এখন ‘হিরো’।