“মারলে মানুষ হয়”— যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই চেনা প্রবাদটি আজও আমাদের সমাজের একটা বড় অংশের মনে গেঁথে রয়েছে। পড়াশোনায় মন না বসালে, পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে বা একটু অবাধ্য হলেই সন্তান কিংবা শিক্ষার্থীকে প্রহার করা বা শারীরিক শাস্তি দেওয়াকে অনেকেই শাসনের অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করেন। অনেকের যুক্তি, “মাঝে মধ্যে একটু-আধটু মারলে ক্ষতি কী? এতে তো বাচ্চার জেদ কমে, পড়াশোনায় মন বসে।” কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান কী বলছে? মারধর কি আদৌ শিক্ষার্থীর কোনও উপকার করে, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বড় কোনও মানসিক বিপর্যয়?
আরও পড়ুন: মহালয়ায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, রেড রোডে তারকাদের সঙ্গে পা মেলালেন মুখ্যমন্ত্রী
ভয়ের আড়ালে চরম ক্ষতি: মনোবিদদের বিশ্লেষণ
আধুনিক মনোবিজ্ঞানী এবং শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শাসনের নামে শিক্ষার্থীদের মারধর বা শারীরিক নির্যাতন উপকারের চেয়ে চরম অপকারই বেশি করে— তা সে নিয়মিত হোক কিংবা মাঝে মধ্যে। মনোবিদদের মতে, শারীরিক শাস্তি সাময়িকভাবে কোনও শিশুকে ভয় দেখিয়ে শান্ত বা বাধ্য করতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা তার মানসিক, আবেগগত ও বৌদ্ধিক বিকাশের অপূরণীয় ক্ষতি করে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মারধরের ফলেও শিক্ষার্থীদের মনে বেশ কিছু গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেগুলি কী আসুন জেনে নিই-
ভয় ও আত্মবিশ্বাসের অভাব
মারের ভয়ে শিশুরা সাময়িকভাবে পড়া মুখস্থ করতে পারে, কিন্তু বিষয়ের প্রতি তাদের স্বাভাবিক আগ্রহ ও সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে এক ধরণের স্থায়ী ভীতি তৈরি হয়, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। তারা নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভয় পায়।
জেদ ও আগ্রাসী মনোভাব বৃদ্ধি
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু শাসনের নামে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, তাদের আচরণেও পরবর্তীতে চরম জেদ ও আগ্রাসী ভাব প্রকাশ পায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে কোনও সমস্যার সমাধান জোর খাটিয়ে বা মারামারি করেই করতে হয়।
লেখাপড়া ও স্কুলের প্রতি তীব্র ক্ষোভ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বাড়িতে মারধর করলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া এবং স্কুলকে এক ধরণের ‘টর্চার সেল’ (Torture Cell) বা অত্যাচার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল পালানো বা মাঝপথে স্কুলছুটের প্রবণতা দেখা যায়।
আরও পড়ুন: দীর্ঘ ২৯ বছরের দাম্পত্যে আজও অটুট প্রেম, শ্রদ্ধা! বরের জন্মদিনে আবেগে ভাসলেন অপরাজিতা
ভবিষ্যতে মানসিক অবসাদ
অনবরত বা মাঝেমধ্যেই শারীরিক শাস্তি ও লাঞ্ছনা শিশুকে হীনমন্যতায় ভোগায়। মনোবিদদের মতে, এই ধরণের শিশুরা বড় হয়ে তীব্র মানসিক অবসাদ (ডিপ্রেশন), অ্যানজাইটি (উদ্বেগ) এবং ব্যক্তিত্বের নানা সমস্যায় ভোগে।
আইন কী বলছে?
বিশ্বের বহু দেশের মতো ভারতেও শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইন রয়েছে। শিক্ষার অধিকার আইন (RTE Act, 2009)-এর ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীদের যে কোনও ধরণের শারীরিক শাস্তি (Corporal Punishment) বা মানসিক হেনস্থা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন বলছে, শাসনের নামে শিশুর গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই।
আরও পড়ুন: ‘বিইং দ্য সলমন খান’: অভিনয়ের ‘এ টু জেড’ শেখাতে নতুন চ্যানেল খুললেন সলমন খান
মারধরের বিকল্প কী? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
মনোবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, ‘শাসন’ মানে অত্যাচার নয়, শাসন মানে সঠিক পথ দেখানো। শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে চালিত করতে মারধরের বিকল্প হিসেবে ‘পজিটিভ ডিসিপ্লিন’ বা ইতিবাচক শৃঙ্খলার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।















