সদ্য শেষ হয়েছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস। এবছর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় আয়োজিত এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ভারতের ঝুলিতে এসেছে মোট ১৩টি সোনা যার মধ্যে ৮টিই দখল করে নিয়েছেন মহিলারা।
আটটি সোনা জয়, কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় মহিলা ক্রীড়াবিদদের নজরকাড়া সাফল্য
সদ্য শেষ হয়েছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস। এবছর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় আয়োজিত এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ভারতের ঝুলিতে এসেছে মোট ১৩টি সোনা যার মধ্যে ৮টিই দখল করে নিয়েছেন মহিলারা।
Sponsored

কমনওয়েলথ গেমসের প্রথম আসর বসেছিল ১৯৩০ সালে অগাস্ট মাসে কানাডার হ্যামিলটনে। ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস’ নামে প্রথমে শুরু হয়েছিল এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ১৯৫৪ সালে নাম বদলে রাখা হয় ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার অ্যান্ড কমনওয়েলথ গেমস’ এবং ১৯৭০ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কমনওয়েলথ গেমস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমনওয়েলথভুক্ত সদস্য রাষ্ট্র এতে অংশ নেয়। প্রতি চারবছর অন্তর আয়োজিত এই খেলায় শুরু দিন থেকেই মহিলারা অংশ নিয়েছেন তখন সাঁতারেই সীমিত ছিল তাঁদের অংশগ্রহণ। পরবর্তীতে গুটি-গুটি পায়ে তাঁরা বিভিন্ন বিভাগে অংশ গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং সাফল্য পান। সেই ধারা অব্যাহত রেখে এই বছর কমনওয়েলথ গেমসে সাফল্যের নজির গড়লেন এদেশের মেয়েরা। ভারতের প্রাপ্ত মোট ১৩টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ৮টিই মহিলাদের দখলে। সোনাজয়ী সেই মেয়েরা গড়েছে ইতিহাস।
ভারোত্তোলনে সাইখোম মীরাবাই
কমনওয়েলথে এবার সোনায় হ্যাটট্রিক করলেন ভারোত্তোলক সাইখোম মীরাবাই চানু। টানা তৃতীয়বার কমনওয়েলথে সোনা জিতলেন তিনি। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মীরাবাই প্রথমে তিরন্দাজ হওয়ার স্বপ্নই দেখেছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে জ্বালানির প্রয়োজনে একটা আস্ত গাছের গুঁড়ি তুলে নিয়ে এসেছিল বাড়িতে। ওই বয়সে অসম্ভব এই শারীরিক শক্তি দেখে পরিবার তাঁকে এই খেলায় উৎসাহিত করে। এরপর ভারোত্তোলনের যাত্রা শুরু। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ট্রাকে বা বাসে চড়ে তিনি অনুশীলনে যেতেন। এরপর রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্তরে উঠে আসেন তিনি। দেশের হয়ে প্রথম খেলতে গিয়েছিলেন রিও অলিম্পিকে। ২০১৬ সালে সেখানে ৪৮ কেজির বিভাগে অংশ নিয়েছিলেন মীরাবাঈ চানু । কিন্তু সাফল্য পাননি। দমে যাননি মীরা। ২০১৭ ওয়ার্ল্ড ওয়েট লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনাজয় করেন। ২০১৮ ও ২২-এ কমওয়েলথে সোনা জেতেন এবং ২০২১ টোকিও অলিম্পিকে রুপোও জেতেন। পেয়েছেন বহু পুরস্কার এবং সম্মানও।
শটপুট-এ শর্মিলা
মাত্র দু’বছর বয়সে ডান পায়ে পোলিও ধরা পড়ে শর্মিলা ধনকড়ের। পরিবার এতটাই দরিদ্র যে আহার জোটানোই মুশকিল ছিল তাঁদের। ফলে চিকিৎসা করাতে পারেননি। শর্মিলার মা ছিলেন দৃষ্টিহীন। বাবা সামান্য চাষী। ফলে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় শর্মিলার। শ্বশুরবাড়িতে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। স্বামীর অত্যাচার এতটাই মারাত্মক ছিল যে একদিন সকাল ১১টা থেকে ভোর ৩টে পর্যন্ত একটানা মারধোর করেছিল শর্মিলাকে! অপরাধ একটাই দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। অঞ্জু ও লক্ষ্মী। পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে পারেননি বলে শেষে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। দুই মেয়েকে নিয়ে ৬ বছর বাপের বাড়িতে ছিলেন শর্মিলা। দ্বিতীয়বার যখন বিয়ে করলেন তখন থেকে তাঁর জীবনটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। স্বামী অজিত সিং ছিলেন ক্রীড়াজগতের ব্যক্তি। অজিতই তাঁকে পরিচয় করান প্যারা স্পোর্টসের সঙ্গে। ৩৪ বছর বয়সে পেশাদার কেরিয়ার শুরু হয় শর্মিলার। শুধু শটপুট নয়, ডিসকাস থ্রোতেও দক্ষ শর্মিলা। দুজন প্রশিক্ষক টেকচাঁদ এবং দেবেন্দ্রর তত্ত্বাবধানে অনুশীলন শুরু করেন। ২০২১-এ প্যারা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অভিষেক হয়। জাতীয় রেকর্ড করে সোনা জেতেন তিনি। এরপর চলতে থাকে সাফল্যের সফর। এই বছর গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে মেয়েদের শটপুটে এফ ৫৭ বিভাগে ৯.৮১ মিটার ছুঁড়ে সোনা জিতেছেন। এই বিভাগের প্রতিযোগীদের হাঁটু এবং তার নীচ থেকে সমস্যা থাকে। ভারতের প্রথম মহিলা ক্রীড়াবিদ হিসাবে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে এই সোনা জিতে নজির গড়েছেন শর্মিলা।
জুডো-য় অস্মিতা
অতীতে কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের ঝুলিতে এসেছে পাঁচটি রুপো এবং ছটি ব্রোঞ্জ। কিন্তু সোনা আসেনি কখনও। এবার তা এল অস্মিতার হাত ধরে। তাঁকে নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হলেও সোনা জয়ের কৃতিত্বে কেউ ভাগ বসাতে পারবে না। দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়ার মেয়ে অস্মিতা। তাঁর বাবা সাইকেলের মেকানিক। অস্মিতা প্রথমে অ্যাথলেটিক্স হিসেবে ৮০০ মিটার দৌড় দিয়ে শুরু করেন ক্রীড়াজীবন। ২০১৫-য় ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুলের কোচের পরামর্শে জুডো শুরু করেন। জাতীয় স্কুল গেমস এবং খেলো ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় ভাল পারফর্ম করে ভোপালের সাই আঞ্চলিক কেন্দ্রে জায়গা পেলেন। জুডো খেলা জারি রাখবার জন্য অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হয়েছে অস্মিতাকে। এসেছে অনেক সাফল্য। এশিয়ান ওপেন, জুনিয়র এশিয়া কাপ জুডো, কমনওয়েলথ জুডোয় পদক জিতেছেন। এবার জিতলেন স্বর্ণপদক।
বক্সিংয়ের পঞ্চকন্যা
বক্সিং রিং-এর মহিলারা এই বছর কমনওয়েলথ গেমস-এ ভারতের ঝুলিতে আনলেন পাঁচ পাঁচটা সোনা। এবারের কমনওয়েলথ গেমে মহিলা বক্সিং দলে ছিলেন ভারতীয় সেনার পাঁচ সদস্য। সেই সোনালি সাফল্যের শুরু হাবিলদার সাক্ষী চৌধুরীর হাত ধরে। ৫১ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছেন সাক্ষী। ভারতীয় বক্সিংয়ের প্রাণকেন্দ্র হরিয়ানার ভিওয়ানি। সেখানকার মেয়ে সাক্ষী ১২ বছর বয়সে ভিওয়ানি বক্সিং ক্লাবে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। দ্রুত দক্ষ হয়ে ওঠেন। এর তিন বছর পর বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন হন এবং ১৮ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি দুবার ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে পরপর বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়ন হন। এই পথে এসেছে অনেক বাধা কিন্তু দমে যাননি।
সোনা জিতছেন নায়েব সুবাদার প্রীতি পাওয়ার। ৫৪ কেজি বিভাগে সোনা জেতেন প্রীতি। ভিওয়ানির মেয়ে প্রীতির বাবা-মা দুজনেই একসময়ের অ্যাথলেট ছিলেন। ১৪ বছর বয়সে তাঁর কাকা ও প্রাক্তন জাতীয় পদকজয়ী বিনোদ পাওয়ার তাঁকে বক্সিং খেলায় নিয়ে আসেন। ভিওয়ানিতেই কাকার আকাডেমিতেই তাঁর প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
এরপর ৫৭ কেজি বিভাগে সোনাজয়ী জ্যাসমিন লাম্বোরিয়ার পরিবারে বক্সিংয়ের এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। তাঁর প্রপ্রিতামহ হাওয়া সিং ছিলেন ভারতের একজন কিংবদন্তি হেভিওয়েট বক্সার, যিনি এশিয়ান গেমসে পরপর দুবার সোনা জিতেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ঘরের দেয়ালে ঝোলানো মেডেল ও ট্রফি দেখে এবং পরিবারের বড়দের সাফল্যের গল্প শুনে জ্যাসমিন বক্সিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন।
৭০ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছেন হাবিলদার অরুন্ধতী চৌধুরী। রাজস্থানের মেয়ে অরুন্ধতী ছোট থেকে খেলাধুলোয় তুখোড়। স্কুলে বাস্কেটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে বক্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। পড়াশুনো শেষ করে সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নেন। ২০১৬ সালে রাজস্থান স্টেট সাব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তিনি তাঁর বক্সিং কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। এরপর শুরু দীর্ঘ লড়াই।
৬০ কেজি বিভাগে পঞ্চম সোনাটি এনেছেন প্রিয়া ঘাংঘাস। ২০১৫ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবার ও দাদার অনুপ্রেরণায় বক্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন। বড় ভাই নীরজ ঘাংঘাসের সঙ্গে তিনি কোচ রবি সাঙ্গোয়ানের কাছে প্রথম প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ২০২২ সালে বিখ্যাত ভিওয়ানির স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বক্সিং অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পান। কোচ মহাবীরের অধীনে প্রশিক্ষিত হতে থাকেন। কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে গড়ে তুলে তিনি আজ দেশের গর্ব।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored












