রাজ্যে পালাবদলের পর প্রথম দুর্গোৎসবকে ঘিরে উদ্বোধনের মঞ্চ থেকেই উন্নয়ন, বাঙালি সংস্কৃতি ও সনাতনী ঐতিহ্যের বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Chief Minister Suvendu Adhikari)। একই সঙ্গে বনগাঁয় দাঁড়িয়ে সিএএ শংসাপত্র, ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং তপশিলি জাতির শংসাপত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দেন তিনি। রানাঘাটের চারের পল্লির ৭৫তম বর্ষের দুর্গাপুজো থেকে কল্যাণীর এ-৯ পার্ক (Kalyani A-9 Park), তারপর বনগাঁর বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব (Vivekananda Sporting Club of Bongaon)। কালকে কলকাতার পর তৃতীয়ায় জেলার পুজো উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে একের পর এক কর্মসূচিতে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী। 

আরও পড়ুন: মহারাষ্ট্রে ‘ওয়াটার কার্ফু’! নাগপুর ও পুণেতে প্রশাসনের নজিরবিহীন কঠোর বিধিনিষেধ

চারের পল্লির দুর্গাপুজোর উদ্বোধন দিয়ে মঙ্গলবারের কর্মসূচি শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী। ফিতে কেটে ও প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন তিনি। উদ্যোক্তাদের তরফে তিলক ও মালা পরিয়ে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় মা দুর্গার ছবি। পুজোর ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ধন্যবাদ জানান সেই সমস্ত মানুষকে, যাঁরা এই অনুষ্ঠানকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরছেন। তাঁর কথায়, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ঐতিহ্য, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও পরম্পরার মেলবন্ধনে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। নতুন সরকার রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি, বাংলার ঐতিহ্য ও সনাতনী পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন: এখনও অধরা প্রশান্ত, রাজ্যকে ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের

দুর্গাপুজোর পরিসর বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরও ১২ হাজার ৪০০টি পুজোকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজ্যে ৪৫ হাজার দুর্গাপুজো হয়েছিল, এ বার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৪০০-তে। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বাংলায় আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রসার ঘটানোর কথাও বলেন তিনি। শ্রীচৈতন্যদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারার উল্লেখ করে কোচবিহারের মদনমোহন মন্দির, মায়াপুর-নবদ্বীপ, তারাপীঠ, তারকেশ্বর, কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বরের মতো তীর্থক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে বাংলাকে আধ্যাত্মিক জাগরণের ভূমি হিসেবে গড়ে তোলার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। চারের পল্লির পুজো যাতে নির্বিঘ্নে ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য জেলাশাসককেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অনুরোধ করেন তিনি। সেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্য কল্যাণী এ-৯ পার্ক সার্বজনীন দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। 

আরও পড়ুন: সুপ্রিম অভিযানে জোড়া FIR! I.N.D.I.A.- র মিছিল ঘিরে আইনি পদক্ষেপ দিল্লি পুলিশের

এরপর বনগাঁর বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। এখানেই তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় মতুয়া সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সমস্যা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বনগাঁর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে তিনি আশাবাদী। তাঁর দাবি, সিএএ শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং আগামী দিনে শংসাপত্র পাওয়া, ভোটার তালিকায় নাম তোলা কিংবা তপশিলি জাতির শংসাপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানুষের অসুবিধা হবে না। বাংলাদেশ থেকে ধর্ম ও প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এ রাজ্যে আসা বহু হিন্দু শরণার্থী ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁদের সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় যাতে কেউ অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে দিকে নজর দেওয়া হবে। পাশাপাশি, ছারপোকাদের থেকে দূরে থাকার কথাও বলেন তিনি।  

আরও পড়ুন: একাধিক দেশকে হুমকি দিয়ে নিজেই রাশিয়া থেকে তেল কিনে 'গলাবাজি' ট্রাম্পের!

বনগাঁর উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ। এলাকার শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং আরও শিল্প গড়ে তোলার পক্ষে কথা বলেন তিনি। আধুনিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের আশ্বাসও দেন। তাঁর কথায়, বনগাঁয় শিল্পের প্রসার ঘটুক এবং এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হোক, সেটাই তাঁর লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, পুজো উদ্বোধনের মঞ্চকে সামনে রেখে একদিকে বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা, অন্যদিকে শরণার্থী সমস্যা, নাগরিকত্ব, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী।