জন্মের সময় কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে যে বাবার অবহেলা জুটেছিল, আজ সেই মেয়েই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ‘পিঙ্ক ক্যাব’ (Pink Cab) চালক এবং মালকিন হিসেবে গোটা রাজ্যের গর্ব। পুরুষতান্ত্রিক পেশার স্টিয়ারিং নিজের হাতে তুলে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি আর জেদ থাকলে চরম অন্ধকার থেকেও আলোয় ফেরা সম্ভব।

আরও পড়ুন: Asian Games: নিখুঁত লক্ষ্যভেদে সোনা জয় নীরুর, শুটিংয়ে একইদিনে জোড়া পদক জয়

মানসী মৃধার জীবনের শুরুটা রূপকথার মতো সহজ ছিল না। তিনি কন্যাসন্তান হওয়ায় তাঁর জন্মের পর বাবা মুখ দেখতে পর্যন্ত আসেননি। পরবর্তীতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন সাধারণ মেয়েরা লেখাপড়া বা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন মানসীর বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্য তাঁর ওপর আরও কঠোর পরীক্ষা নেয়। কোলে এক দুধের শিশু থাকা অবস্থাতেই তিনি বিধবা হন।

স্বামীর মৃত্যুর পর চরম নির্মমতার শিকার হতে হয় মানসীকে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বাপের বাড়ির দরজাও তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এক মুঠো ভাতের জন্য ক্ষুধার্ত পেটে কোলের সন্তানকে বাঁচানোর লড়াই শুরু হয় মানসীর। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে তিনি কোন কাজকেই ছোট মনে করেননি। অন্যের বাড়িতে বাসন মাজা থেকে শুরু করে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি কাপড় ফেরি করার মতো কঠিন পরিশ্রম করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন: “Don’t Miss a Beat”: বিশ্ব হার্ট দিবস-এ কী বলছে আপনার হৃদয়

যখন চারদিকের সব পথ বন্ধ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই মানসীর জীবনে আশার আলো নিয়ে আসে ‘আজাদ ফাউন্ডেশন’। এই সংস্থার সহায়তায় তিনি আট মাসের একটি অত্যন্ত কঠিন ড্রাইভিং ট্রেনিং সম্পন্ন করেন। যে হাতে একসময় রান্নার খুন্তি কিংবা কাপড় ফেরির ব্যাগ থাকত, সেই হাত অভ্যস্ত হয়ে ওঠে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে।

২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নারীদের স্বনির্ভর ও সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ‘পিঙ্ক ক্যাব’ প্রকল্প চালু করে। এই সরকারি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৫০ জন নারী আবেদন করেছিলেন। কিন্তু নিজের যোগ্যতা এবং মেধার জোরে মেধা তালিকায় এক নম্বর স্থানটি ছিনিয়ে নেন মানসী মৃধা। স্বয়ং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে রাজ্যের প্রথম পিঙ্ক ক্যাবের চাবিটি তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতেই।

আরও পড়ুন: প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারির দাবিতে সিঙ্গুরে বিক্ষোভ

শুরুর দিকে একটি সম্পূর্ণ পুরুষপ্রধান পেশায় আসতে গিয়ে মানসীকে নানারকম সামাজিক টিপ্পনী এবং হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু কোনও বাধাই তাঁর পথ আটকাতে পারেনি। আজ তিনি শুধু রাস্তায় গাড়ি চালানো একজন চালকই নন, তিনি নিজের গাড়ির নিজেই একজন গর্বিত মালিক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর এই অদম্য লড়াইকে কুর্ণিশ জানিয়ে তাঁকে ‘সাহসিকতার সম্মান’-এ ভূষিত করেছে।

যে আত্মীয় ও সমাজ একদিন তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আজ তারাই মানসী মৃধার নামে গর্ব বোধ করে। তাঁর এই অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ সমাজকে এক নতুন বার্তা দেয়। নিজের লড়াই প্রসঙ্গে মানসী মৃধা বলেন, “স্বপ্ন দেখা কখনও ছেড়ো না। লোকে যাই বলুক না কেন, নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকলে একদিন সাফল্য আসবেই।” মানসী মৃধার এই রূপকথা আজ বাংলার হাজার হাজার লড়াকু নারীর বুকে নতুন করে বাঁচার এবং লড়াই করার সাহস জোগাচ্ছে।