উৎসবের মুখে তিলোত্তমার নামী হোটেল-রেস্তোরাঁগুলির হেঁশেলের অন্দরে কঙ্কালসার চেহারাটা আবারও বেআব্রু হয়ে পড়ল। খাবারের প্লেটে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া পদগুলির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ হাতেনাতে ধরলেন রাজ্য খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা। বৃহস্পতিবার ভরদুপুরে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গোলপার্কের একাধিক স্বনামধন্য খাদ্য প্রতিষ্ঠানে একযোগে হানা দেয় তদন্তকারী দল। তালিকায় শহরের অন্যতম প্রাচীন মিষ্টির বিপণি ‘গাঙ্গুরাম সুইটস’ থেকে শুরু করে বিরিয়ানির জনপ্রিয় ঠিকানা ‘আমিনিয়া’ ও মোগলাইয়ের শৌখিন কেন্দ্র ‘করিম’স’। আর প্রতিটি জায়গাতেই মিলেছে থরে থরে বেনিয়ম।

আরও পড়ুন: মোদিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ক্রীড়াজগতের, প্রধানমন্ত্রীর ক্রিকেট-প্রীতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা

এদিন গোলপার্কের গাঙ্গুরাম সুইটসে আচমকাই হাজির হন খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা। বিপণির পাশাপাশি তাঁদের মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার তৈরির কারখানাতেও ঢোকেন তাঁরা। সেখানে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। কারখানার পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটি আসে যখন গাঙ্গুরামের সিল করা নিমকির প্যাকেটের ভেতরে জ্বলজ্বল করতে দেখা যায় একটি পাখির পালক! স্ন্যাক্সের প্যাকেটে এমন জিনিস দেখে ক্ষোভ উগরে দেন আধিকারিকরা। এ বিষয়ে দোকানের এক কর্তাকে জেরা করা হলে তিনি কার্যত দোষ স্বীকার করে নিয়ে বলেন, “ভুল করে চলে এসেছে। এটা একেবারেই ঠিক হয়নি।” এখানেই শেষ নয়, কারখানার বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পারেননি কর্তৃপক্ষ এবং সেখানে ২০০১ সালের একটি মেয়াদ উত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারও ঝুলতে দেখা যায়।

আরও পড়ুন: ৭৬তম জন্মদিনে বাংলাকে মোদির ‘অন্নপূর্ণা’ বার্তা, ফের উঠল ‘কাটমানি’ প্রসঙ্গ

গাঙ্গুরামের পর আধিকারিকদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল গোলপার্কের ‘আমিনিয়া’। বিরিয়ানিতে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক রঙ বা সুগন্ধী ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি রান্নাঘরের ফ্রিজগুলি তল্লাশি করা হয়। সেখানে দেখা যায়, দিনের পর দিন জমিয়ে রাখা হয়েছে বাসি কাবাব ও মোমো। ফ্রিজ থেকে উদ্ধার হয় মেয়াদ উত্তীর্ণ বিপুল পরিমাণ ফিরনি এবং সস, যা সঙ্গে সঙ্গে আবর্জনার বালতিতে ফেলে নষ্ট করে দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে মারাত্মক কাণ্ডটি দেখা যায় দুধের প্যাকেটে, যার ভেতরে মরা আরশোলা ভাসছিল! আধিকারিকরা তৎক্ষণাৎ সেই সমস্ত দুষিত সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করার নির্দেশ দেন। 

আরও পড়ুন: আদালত বলছে না- অধিকারের দাবিতে আন্দোলন হবে না: ২৬ শ্রীরামপুরে মমতার সভার অনুমতি দিয়ে মন্তব্য বিচারপতি ভট্টাচার্যের

একইভাবে গোলপার্কের ‘করিম’স’ আউটলেটেও হানা দেন খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা। সেখানেও রান্নাঘরের হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতার মান ঠিকঠাক রয়েছে কিনা, খাবার মজুত করার ক্ষেত্রে কোনও বেনিয়ম হচ্ছে কিনা তা সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তবে করিম’স ও আমিনিয়ার মতো কলকাতার বেশ কিছু বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁর লাইসেন্স সম্প্রতি কেএমসি (KMC) সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও, ত্রুটি সংশোধন করার পর বেশ কয়েকটি আউটলেটকে পুনরায় খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজকের এই নয়া অভিযানে গোলপার্ক অঞ্চলের আউটলেটগুলিতে পুনরায় একাধিক গাফিলতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র সামনে চলে এসেছে।

আরও পড়ুন: পুজোর মুখে স্বস্তি টলিপাড়ায়? অবশেষে খুলছে ফেডারেশনের তালা

খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, “কলকাতার মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনও রকম আপস করা হবে না। ব্র্যান্ডের নাম যত বড়ই হোক, হেঁশেল নোংরা রাখলে বা বাসি-পচা খাবার খাওয়ালে কাউকেই রেয়াত করা হবে না।” আজকের এই অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট দোকান ও রেস্তোরাঁগুলিকে কড়া নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিকাঠামোর বদল না ঘটলে আরও বড়ো আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। শহরের এই নামী ব্র্যান্ডগুলির এমন বেপরোয়া মনোভাবের ছবি সামনে আসতেই তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে কলকাতার খাদ্যরসিকদের মনে।