ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এবং গজলের দুনিয়ায় তিনি ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকত গোটা উপমহাদেশ। তিনি আখতারীবাই ফৈজাবাদী, যিনি পরবর্তীতে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হন ‘বেগম আখতার’ নামে। এক সাধারণ বাইজি পরিবার থেকে উঠে এসে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ জয় করার এই যাত্রা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। একাধারে অবহেলা, রাজপরিবারের হারেমের অন্ধকার, আবার অন্যদিকে সুরের আলোয় বিশ্বজয়— সব মিলিয়ে বেগম আখতারের জীবন এক জীবন্ত মহাকাব্য।

আরও পড়ুন: টাকি রোডে ফের পাচারের ছক! দেগঙ্গায় উদ্ধার ১৫টি গরু, গ্রেফতার এক

১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আখতারীবাই। শৈশব থেকেই নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস তাড়া করেছিল তাঁকে। বাবা আজগর হুসেন তাঁদের ত্যাগ করেন। মা মুস্তারি বেগম দুই যমজ কন্যাসন্তান আখতারী ও আনোয়ারীকে নিয়ে লখনউ চলে আসেন। সেখানে মাত্র সাত বছর বয়সে এক আত্মীয়ের দেওয়া বিষে মারা যায় আখতারীর বোন আনোয়ারী। একা হয়ে পড়া আখতারীকে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং পরিবারের হাল ধরতে লখনউয়ের কোঠায় গান শেখা শুরু করতে হয়। ওস্তাদ ইমদাদ খান এবং আতা মোহাম্মদ খানের অধীনে কড়া রেওয়াজে তৈরি হতে থাকেন তিনি। খুব দ্রুতই লখনউয়ের বাইজি মহলে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: সরকারি ইঞ্জিনিয়ারের বিছানার নীচে ৫০ লক্ষ টাকা! তল্লাশিতে তদন্তকারীদের চক্ষু চড়কগাছ

রূপ আর গুণের মেলবন্ধনে আখতারীবাই তখন অনন্য। তাঁর এই জনপ্রিয়তাই তাঁর জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। মাত্র তেরো বছর বয়সে বিহারের এক শক্তিশালী রাজার নজর পড়ে তাঁর ওপর। লখনউ থেকে তাঁকে কার্যত অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় সেই রাজপরিবারের হারেমে। সেখানে দীর্ঘ সময় বন্দি থাকতে হয় তাঁকে। শুধু তাই নয়, সেই হারেমেই চরম লাঞ্ছনা ও ধর্ষণের শিকার হতে হয় নাবালিকা আখতারীকে। ফলস্বরূপ মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সেই এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি, যাকে লোকলজ্জার ভয়ে আজীবন নিজের ‘বোন’ বলে পরিচয় দিতে হয়েছিল তাঁকে।

আরও পড়ুন: বকেয়া সম্পত্তি করে বিপুল ছাড়! কলকাতার করদাতাদের জন্য বড় ঘোষণা পুরসভার

হারেমের সেই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে আখতারীবাই ভেঙে পড়েননি। বরং ফিনিক্স পাখির মতো সুরকে আঁকড়ে ধরে আবার বেঁচে ওঠেন। ১৯৩৪ সালে বিহারের এক ভূমিকম্পের ত্রাণ তহবিলের জন্য আয়োজিত জলসায় তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন স্বয়ং সরোজিনী নাইডু। তিনি আখতারীকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেন। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। গ্রামোফোন রেকর্ড, থিয়েটার এবং পরবর্তীতে কলকাতার সিনেমা জগৎ— সর্বত্রই নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন তিনি। ‘নসীব কা চক্কর’, ‘জলসাঘর’-এর মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয় ও গান আজও কালজয়ী।

লখনউয়ের নামী আইনজীবী ইশতিয়াক আহমেদ আব্বাসীর প্রেমে পড়েন আখতারীবাই। ১৯৪৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। কিন্তু রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের বউ হওয়ার শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন— ‘বাইজি’ পরিচয় মুছে ফেলতে হবে এবং আসরে গান গাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ভালোবাসার টানে দীর্ঘ পাঁচ বছর গান থেকে দূরে ছিলেন তিনি। কিন্তু সুর যাঁর রক্তে, গান ছাড়া তিনি বাঁচবেন কী করে? গান গাইতে না পেরে বেগম আখতার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, গানই পারে একমাত্র তাঁকে সুস্থ করতে। অবশেষে স্বামীর অনুমতি নিয়ে ১৯৪৯ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর মাধ্যমে আবার গান গাইতে শুরু করেন তিনি। এবার আর ‘আখতারীবাই’ হিসেবে নয়, সম্মানীয় ‘বেগম আখতার’ হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে।

আরও পড়ুন: মাঝআকাশে বাঁচিয়েছেন শতাধিক প্রাণ, ইজরায়েলের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতীয় পাইলটকে

ফিরে আসার পর তাঁর গায়কি আরও পরিপক্ক এবং আবেগঘন হয়ে ওঠে। মির্জা গালিব, ফৈজ আহমেদ ফৈজ, জিগর মোরাদাবাদীর গজল তাঁর কণ্ঠে এক অন্য মাত্রা পায়। শ্রোতারা তাঁকে ‘মল্লিকা-এ-গজল’ বা গজলের রানি উপাধিতে ভূষিত করেন। সংগীত দুনিয়ায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ১৯৬৮ সালে পদ্মশ্রী এবং ১৯৭৫ সালে (মরণোত্তর) দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ-এ ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৭২ সালে তিনি সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

‘জলসাঘর’ ছবিতে বাইজির ভূমিকায় আখতারীকে রাজি করানো প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলেন, “আমরা লখনউ গেলাম। ওঁকে বললাম। শুরুর দিকে উনি রাজি হননি। আমার এক আত্মীয় তখন লখনউয়ের ব্যারিস্টার। উনি আখতারীর স্বামীর ভালো বন্ধু। শেষে উনিই রাজি করান।”

আরও পড়ুন: রাত আটটায় ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ রাষ্ট্রপতির, ‘সময়’ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কুণাল

১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর কেরালার তিরুবনন্তপুরমে এক কনসার্টে দুর্বল শরীরে, গায়ে জ্বর নিয়ে একের পর এক অনুরোধে জনপ্রিয় সব গান উঁচু স্কেলে গাইতে থাকেন। শেষ অনুরোধ আসে ‘অ্যায় মোহাব্বত, তেরি আনজাম পে রোনা আয়া’ গানের। এই গান গাইতে গাইতেই মঞ্চে তৃতীয়বারের জন্য হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও এর ঠিক চার দিন পর ৩০ অক্টোবর ৬০ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হারেমের অন্ধকার কুঠুরি থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা মঞ্চ— বেগম আখতারের জীবন প্রমাণ করে যে, প্রতিভাকে কোনো দেওয়াল বা সামাজিক গণ্ডি দিয়ে আটকে রাখা যায় না। বাইজি থেকে গজলের রানি হয়ে ওঠার এই রূপকথা ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।